বিজেপির দুর্গে ধস! প্রশান্ত কিশোরের ঐতিহাসিক জয়েও কেন মুখে কুলুপ মমতা-অভিষেকের?

বিহারের রাজনীতির আঙিনায় এক অবিশ্বাস্য ও অভাবনীয় রাজনৈতিক ভূমিকম্প ঘটে গেল। দীর্ঘ তিন দশক ধরে অটুট থাকা ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) দুর্গে বড়সড় ধস নামিয়ে বাঁকিপুর উপনির্বাচনে পদ্মশিবিরকে একপ্রকার মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছেন ভোটকে কৌশল থেকে সোজা রাজনীতিতে নামা প্রখ্যাত রাজনৈতিক পিকে তথা প্রশান্ত কিশোর (Prashant Kishor)। বিজেপি সভাপতির ছেড়ে যাওয়া এই মর্যাদাপূর্ণ আসনে প্রশান্ত কিশোরের দল জন সুরাজ পার্টির এই ঐতিহাসিক জয় কেবল বিহারের গণ্ডিই পেরোয়নি, বরং পুরো জাতীয় রাজনীতিকেই প্রবলভাবে আন্দোলিত করেছে। খাস গেরুয়া শিবিরের এমন বিপর্যয়ের পরেও যেখানে গোটা দেশ তোলপাড়, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ছবি দেখা গেল বাংলার ক্ষমতাসীম শিবির কালীঘাটে। বিজেপির এই শোচনীয় পরাজয় এবং প্রশান্ত কিশোরের এই বিশাল সাফল্যের পর সোমবার রাত গড়িয়ে গেলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফ থেকে সামাজিক মাধ্যম এক্স (X) হ্যান্ডলে কোনো ধরনের অভিনন্দন বার্তা বা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়নি।
সাধারণত দেশের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পালাবদল, প্রতিবাদ কিংবা শুভেচ্ছা জানানোর ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত প্রতিক্রিয়া জানানোই মমতা এবং অভিষেকের রাজনৈতিক রুটিন। কিন্তু পিকে-র এই অভাবনীয় জয়ের ক্ষেত্রে তাঁদের এই নীরবতা রাজনৈতিক মহলে তীব্র কৌতূহল ও জল্পনার সৃষ্টি করেছে। সোমবার বিকেল ৪টার মধ্যেই যখন ফলাফল একপ্রকার স্পষ্ট হয়ে যায় এবং সন্ধ্যা নাগাদ পিকে নিজের জয়ের শংসাপত্র হাতে তুলে নেন, তখনও কালীঘাটের শীর্ষ নেতৃত্ব মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন। এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা না হলেও, কালীঘাট ঘনিষ্ঠ প্রবীণ নেতা ও সাংসদদের অন্দরমহলের আলোচনায় মূলত দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ উঠে এসেছে। প্রথমত, বিহারের রাজনীতিতে মমতা ও অভিষেকের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বা ‘বন্ধুদল’ হলো লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল (RJD), যা আবার জাতীয় স্তরের বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA)-রও অন্যতম প্রধান শরিক। কিন্তু প্রশান্ত কিশোরের জন সুরাজ পার্টি সেই জোটের অংশ নয়। তাছাড়া বাঁকিপুরের এই উপনির্বাচনে বিজেপি পরাজিত হলেও লালু-পুত্র তেজস্বী যাদবের দলের প্রার্থীর ভরাডুবি হয়েছে এবং তারা একেবারে তৃতীয় স্থানে চলে গেছে। বিজয়ী পিকে-র সঙ্গে আরজেডি প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ৫০ হাজারের কাছাকাছি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে প্রশান্তকে অভিনন্দন জানালে জেনেশুনে ইন্ডিয়া জোটের শরিক আরজেডিকে চরমভাবে চটিয়ে দেওয়া হতো, কারণ প্রচারের শুরু থেকেই লালুর দল পিকের পার্টিকে বিজেপির ‘বি টিম’ বলে আক্রমণ শাণিয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, প্রশান্ত কিশোরকে প্রকাশ্যে অভিনন্দন জানানোর অর্থই হলো অতীতে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দহরম-মহরম এবং প্রশান্তের সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)-এর প্রসঙ্গটিকে ফের অপ্রাসঙ্গিকভাবে উসকে দেওয়া। অতীতে একুশের বিধানসভা নির্বাচনের সময় তৃণমূলের জয়ের পেছনে ভোটকুশলী হিসেবে পিকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পিকে পেশাদার স্ট্র্যাটেজিস্টের কাজ ছেড়ে নিজে দল গঠন করে বিহারে সক্রিয় রাজনীতিতে নামতেই তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সমীকরণ দ্রুত বদলে যায়। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের সময় থেকেই প্রশান্তের সঙ্গে বাংলার শাসকদলের সম্পর্কে স্পষ্ট শীতলতা তৈরি হয়েছিল। এমনকি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি সাক্ষাৎকারে প্রশান্তকে ‘ওভার রেটেড’ বা অতিরিক্ত গুরুত্ব পাওয়া ব্যক্তি হিসেবে কটাক্ষ করতেও পিছপা হননি। অন্যদিকে, প্রশান্ত কিশোরও বিভিন্ন সময়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলের ভেতরের দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে একাধিক তীব্র মন্তব্য করে রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন। এমনকি বাঁকিপুরের নির্বাচনী প্রচারের সময়ও পিকে প্রকাশ্যে হুংকার দিয়ে বলেছিলেন যে, ২০২১ সালে তিনি না থাকলে বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজও মুখ্যমন্ত্রী হতে পারতেন না। এই সমস্ত অতীত তিক্ততা, সংঘাত এবং রাজনৈতিক সমীকরণ মাথায় রেখেই মমতা ও অভিষেক সুকৌশলে এই জয় থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।