১৯ বছর পর মুখ খুললেন তসলিমা! বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ভয়ঙ্কর অত্যাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস

দীর্ঘ ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরেছেন প্রখ্যাত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। ভারতে বসেই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। লেখিকার স্পষ্ট দাবি, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলেও সেখানকার হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি; বরং সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও অবনতির দিকে গিয়েছে।
তসলিমা নাসরিনের বিস্ফোরক অভিযোগ
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তসলিমা অভিযোগ করেন যে, ইউনূসের শাসনকাল থেকেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাঁর মতে, দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ও মসজিদে ধারাবাহিকভাবে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, যা গোটা সমাজের জন্যই অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর আগেও বাংলাদেশে মৌলবাদের বিরুদ্ধে এবং হিন্দুদের ওপর চলা নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন তিনি। সম্প্রতি গাইবান্ধার পলাশবাড়িতে রামচন্দ্রের ৮১ ফুট উঁচু মূর্তি তৈরির কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় কড়া প্রশ্ন তুলেছিলেন এই লেখিকা।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিএনপির নেতা তারেক রহমান। তাসহ বিভিন্ন মহলের প্রশ্ন, নতুন সরকারের অধীনে প্রতিবেশী দেশে সংখ্যালঘুদের প্রকৃত পরিস্থিতি কেমন?
ঐক্য পরিষদের চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন) দেশজুড়ে ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে হিংসার শিকার হয়েছেন মোট ২৬১ জন মানুষ।
সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান:
হত্যা: বিগত ৬ মাসে ৪০টি ঘটনায় ৪৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
উপাসনালয়ে হামলা: ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে ৬২টি এবং উপাসনালয়ের জমি দখলের ঘটনা ১৫টি।
বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা: লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ৪৭টি।
অন্যান্য অপরাধ: নারী নির্যাতন বা ধর্ষণ (৫টি), অপহরণ ও চাঁদা দাবি (১০টি), ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার ও নির্যাতন (৯টি) এবং জোরপূর্বক সম্পত্তি দখলের ঘটনা ঘটেছে ২১টি।
বদলেছে নির্যাতনের ধরন ও পদ্ধতি
মানবাধিকার সংস্থাগুলির রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের শুধু সংখ্যাই বাড়েনি, পাল্টেছে তার পদ্ধতি ও প্রকৃতিও। শেখ হাসিনার আমলেও সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হলেও অপরাধীদের বিচার বা শাস্তির নজির ছিল বিরল। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে যে ‘মব-সন্ত্রাস’ বা দলবদ্ধ হিংসার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, বর্তমান তারেক রহমানের আমলেও তা সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অস্থিরতার সুযোগে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ও জাতিগত জনগোষ্ঠীর ওপর দমনপীড়ন মাত্রা ছাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা এবং ‘হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ়’ (HRCBM)-এর যৌথ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ৩,১০০টি হিংসাত্মক আক্রমণ নথিবদ্ধ হয়েছে। দেশের ৮টি বিভাগের ৬২টি জেলায় শারীরিক নিগ্রহ, হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মতো ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া, দেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক) এবং ‘মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন’-এর বুলেটিনেও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নতুন সরকার কাঠামোগত সংস্কারের কথা বললেও বাস্তবে সাধারণ সংখ্যালঘুদের জীবন ও সম্পত্তির ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।