জ্যান্ত কেউটেকে কোলে নিয়ে পুজো! সাপের কামড় এখানে অভিশাপ নয়, সাক্ষাৎ ‘মায়ের প্রসাদ’

‘ছোটে না কি হাঁটে না, কাউকে যে কাটে না…’—পল্লীকবি সুকুমার রায়ের অমর পংক্তির এই চেনা রূপকথা যেন হুবহু সত্যি হয়ে ধরা দেয় পূর্ব বর্ধমানের কালনা মহকুমার মঙ্গলকোট ব্লকের পলসোনা গ্রামে। আধুনিক সভ্যতার যুগেও যেখানে বিষধর সাপের নাম শুনলে মানুষের রক্ত হিম হয়ে যায়, ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখা যায় এই প্রাচীন গ্রামে। এখানে কোনো লুকোচুরি বা সাপুড়ের বাঁশির খেলা নয়, বরং মহা সমারোহ ও ভক্তির সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় আস্ত জ্যান্ত কেউটে সাপের পূজা। তবে গ্রামবাসীর কাছে এই ভয়ংকর ফণাধারী কালনাগিনী কোনো সাধারণ ‘সাপ’ নয়, তাঁরা পরম শ্রদ্ধায় এই জীবন্ত বিষধরদের ‘মা ঝঙ্কেশ্বরী’ রূপে পুজো করেন। প্রতি বছর নির্দিষ্ট এই বিশেষ পুজোকে কেন্দ্র করে গোটা গ্রাম জুড়ে এক অভূতপূর্ব উৎসবের আমেজ তৈরি হয়, এবং বৃহস্পতিবার এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও কৌতূহলী মানুষ গ্রামে ভিড় জমান।
গ্রামবাসীদের দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠ দাবি ও অন্ধ বিশ্বাস অনুযায়ী, পলসোনা গ্রামের অলিগলি এবং বাড়ির আশেপাশে অবাধে ঘুরে বেড়ায় মারাত্মক বিষধর কেউটে সাপ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বংশপরম্পরায় গ্রামের মানুষ এই সাপগুলোকে চোখের সামনে দেখে বড় হয়ে উঠলেও আজ পর্যন্ত এই সাপগুলোর কারণে কোনো মানুষের কোনো ধরনের ক্ষতি বা অঘটন ঘটেনি। স্থানীয় মানুষের সুদৃঢ় বিশ্বাস, প্রাচীন মনসামঙ্গল কাব্যে উল্লেখিত দেবী লহনা বা বেহুলা-লক্ষিন্দরের পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত সেই দেবীই এই অঞ্চলে ঝঙ্কেশ্বরী রূপে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। পুজোর মূল আকর্ষণ থাকে সন্ধ্যার একটি বিশেষ আচার; এদিন সন্ধ্যায় সমগ্র গ্রামে জ্যান্ত সাপ নিয়ে এক বর্ণাঢ্য পরিক্রমা সম্পন্ন হয় এবং তারপর মন্দিরের সামনে একটি পবিত্র মাটির কলস ভাঙা হয়। গ্রামবাসীদের দৃঢ় বিশ্বাস, সেই ভাঙা কলসের টুকরো বা খণ্ড যদি কেউ পরম যত্নে নিজেদের বাড়িতে এনে রাখতে পারে, তবে বিষধর সাপ কখনই সেই বাড়িতে প্রবেশ করার সাহস পায় না। এমনকি এই গ্রামের মানুষ সাপের কামড় বা দংশন প্রক্রিয়াকে কোনো শারীরিক যন্ত্রণাদায়ক অভিশাপ বলে মনে করেন না, বরং তারা পরম ভক্তিভরে তাকে দেবীর ‘প্রসাদ’ বলে মেনে নেন।
উল্লেখ্য, শুধুমাত্র পলসোনা গ্রাম একাই নয়, এর পাশাপাশি মঙ্গলকোটের ছোটপোষলা, মুসারু, নিগন এবং পার্শ্ববর্তী ভাতারের বড় পোষলা, শিকোত্তর ও মুকুন্দপুরসহ মোট সাতটি গ্রামে এই প্রাচীন ঝঙ্কেশ্বরী পুজোর বিশেষ প্রচলন রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই জনপদের ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্বকে সম্মান জানিয়ে বৃহস্পতিবার মঙ্গলকোটের বিধায়ক শিশির ঘোষও সশরীরে পলসোনার ঝঙ্কেশ্বরী মন্দিরে উপস্থিত হয়ে দেবীর চরণে পুজো দেন এবং আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন।
যদিও সাধারণ মানুষের এই অগাধ ভক্তি ও বিশ্বাসের বিপরীতে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক মতামত দিয়েছেন বিশিষ্ট সর্পবিশারদরা। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সর্পবিশারদ ধীমান ভট্টাচার্য সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, গ্রামের এই নির্দিষ্ট অঞ্চলে অবাধে ঘুরে বেড়ানো সাপগুলির সিংহভাগই অত্যন্ত বিষাক্ত কেউটে প্রজাতির। তাঁর মতে, বিজ্ঞানসম্মতভাবে এই সাপের বিষক্রিয়া মারাত্মক হতে পারে এবং এর কামড়ে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারে। তবে তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন যে, দীর্ঘ বহু বছর ধরে মানুষ ও সাপের এই শান্তিপূণ সহাবস্থানের কারণে এবং গ্রামের বাসিন্দারা কখনোই এই বন্যপ্রাণীগুলিকে অকারণে বিরক্ত বা প্রহার না করায়, এই এলাকায় সাপের দ্বারা মানুষ দংশিত হওয়ার ঘটনা তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম ঘটে।