পাথর মাফিয়া টুলু মণ্ডলের বাড়িতে ইডির নজর! বিপুল সোনা ও নগদ উদ্ধারের পরেই জোরদার তদন্ত শুরু

আর্থিক তছরুপ, বেআইনি লেনদেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক গুরুতর অভিযোগে এবার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর সরাসরি নজরে এলেন বীরভূমের কুখ্যাত পাথর মাফিয়া মহম্মদ নিজামুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডল। ইডি সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই বীরভূম জেলা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে টুলুর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলা ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সমস্ত নথি সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। মূলত তাঁর বিশাল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন, বেনামি সম্পত্তি এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংস্থার কার্যকলাপ বর্তমানে নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার প্রাথমিক দাবি, এর অনেক আগে থেকেই টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে একাধিক আর্থিক অনিয়ম ও তছরুপের অভিযোগ জমা পড়েছিল। রাজ্যের বিভিন্ন থানায় তাঁর নামে মোট ছয় থেকে সাতটি ফৌজদারি মামলাও দায়ের রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেই সমস্ত পুরোনো মামলার কেস ডায়েরি ও আইনি নথিপত্রও নতুন করে খুঁটিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ইডি সূত্রে জানা গেছে, এর আগে একটি মামলায় প্রায় এক মাস জেল হেফাজতেও কাটাতে হয়েছিল এই পাথর মাফিয়াকে। গোয়েন্দাদের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পরিধিতে রয়েছে গুরুতর আর্থিক প্রতারণা, জনগণের অর্থ আত্মসাৎ এবং সন্দেহজনক ও বেআইনি ব্যাংক লেনদেন।

তদন্তের প্রথম ধাপে নেমে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে নিউটাউন এলাকায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকার একটি সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন বা বিনিয়োগের বিষয়টি ইডির গোয়েন্দাদের নজরে এসেছে। ওই বিপুল পরিমাণ অর্থের মূল উৎস কী ছিল, কী প্রকৃতির লেনদেন হয়েছিল এবং এর নেপথ্যে কোন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ইডি সূত্রে আরও চাঞ্চল্যকর খবর মিলেছে যে, টুলু মণ্ডলের স্ত্রী ও মেয়ের নামে একাধিক ভুয়ো সংস্থা বা কোম্পানির হদিশ পেয়েছেন গোয়েন্দারা। ওই সংস্থাগুলির আড়ালেই কোটি কোটি টাকার বেআইনি লেনদেন চালানো হয়েছে বলে জোরালো সন্দেহ করছেন তদন্তকারীরা। বর্তমানে ওই কোম্পানিগুলির সমস্ত আর্থিক নথি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, শেয়ারহোল্ডিং প্যাটার্ন এবং বিশাল সম্পত্তির উৎস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হচ্ছে। প্রয়োজনে এই দুর্নীতিচক্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খুব শীঘ্রই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হতে পারে বলেও ইডি সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।

তদন্তকারী সংস্থার প্রাথমিক অনুমান, টুলু মণ্ডলকে কেন্দ্র করে এই আর্থিক লেনদেনের জাল এতটাই বিস্তৃত যে এর পেছনে মানি লন্ডারিং বা অর্থপাচারের শক্তিশালী যোগ রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। বীরভূম জেলা পুলিশের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে আগামী দিনে এই তদন্তের পরিধি আরও অনেকদূর বিস্তৃত হতে পারে। টুলুর একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য ঘেঁটে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন যে, তিনি তাঁর একাধিক আত্মীয় এবং পরিজনের নামে বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু সেল কোম্পানি বা খোলস কোম্পানি খুলেছিলেন। ইডির জোরালো অনুমান, এই সমস্ত শেল কোম্পানি তৈরি করেই কোটি কোটি টাকার কালো টাকাকে সাদা টাকায় রূপান্তরিত করার রমরমা কারবার চালিয়েছিলেন টুলু।

তবে গোয়েন্দাদের মতে, টুলু মণ্ডলের পক্ষে এককভাবে এত বড় মাপের কোনো আর্থিক দুর্নীতি চক্র পরিচালনা করা কার্যত অসম্ভব। সেই কারণেই টুলুর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং তাঁকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছে ইডি। তদন্তের বর্তমান অগ্রগতির স্বার্থে খুব শীঘ্রই টুলুর সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা। গোয়েন্দাদের আরও ধারণা, টুলু একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্বের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থেকে এই সমস্ত বেআইনি কাজ চালিয়ে গেছেন এবং এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের একটি বড় অংশ বিভিন্ন প্রভাবশালী আত্মসাৎ করেছেন।

উল্লেখ্য, গত বুধবার ভোরবেলা থেকে বীরভূমের মহম্মদবাজারে পাথর মাফিয়া টুলু মণ্ডলের আত্মীয় মীনার মণ্ডলের বাড়িতে আকস্মিক হানা দিয়েছিল বীরভূম জেলা পুলিশের একটি বিশেষ দল। জেলা পুলিশ সুপার সূত্রে জানা যায়, ওই তল্লাশি অভিযানে বাড়িটির ভেতর থেকে চোখ কপালে তোলার মতো নগদ সাড়ে ২৮ কোটি টাকা এবং ১৫ কেজি ওজনের সোনার বাট উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া এই বিশাল পরিমাণ সোনার বাটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২২ কোটি টাকারও বেশি। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় তৎক্ষণাৎ মীনার মণ্ডল ও তাঁর ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে মহম্মদবাজার থানার পুলিশ। বীরভূম জেলা পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জেরা করার পর ধৃত মীনার মণ্ডল স্বীকার করে নিয়েছেন যে এই বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও সোনা আদতে ওই পাথর মাফিয়া টুলু মণ্ডলেরই।

আর এই বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, কোটি কোটি টাকার সোনার গয়না এবং সোনা উদ্ধারের নেপথ্যের আসল রহস্য উন্মোচনে এখন মরিয়া ইডি। কোন কোন খাতে ও কী উদ্দেশ্যে এই অর্থ ব্যয় করা হতো, কীভাবে এই গোটা সাম্রাজ্য পরিচালিত হতো, এই অর্থ পরিচালনার নেপথ্যে আর কারা কারা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন এবং কোন প্রভাবশালী মহলের অঙ্গুলিহেলনে এক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা সরিয়ে নেওয়া হতো—এই সমস্ত জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এবার ময়দানে নেমে পড়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।