রাজ্যে বিলুপ্তপ্রায় ফার্ন রক্ষায় বিরাট উদ্যোগ! কোলকাতা সহ ৬টি অঞ্চলে তৈরি হচ্ছে বিশেষ ‘ফার্ন পার্ক’!

রাজ্যের বিলুপ্তপ্রায় ও বিপন্ন ফার্ন প্রজাতিকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে এবার এক অভিনव ও বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সাধারণ মানুষের মধ্যে জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ফার্ন সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে রাজ্যজুড়ে ‘ফার্ন বায়োডাইভারসিটি পার্ক’ বা ফার্ন জীববৈচিত্র্য পার্ক গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য সরকারের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জৈবপ্রযুক্তি দফতর। প্রাথমিকভাবে কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এই বিশেষ পার্কগুলি তৈরি করার রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।
কোথায় গড়ে উঠবে এই পার্কগুলি?
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে কলকাতার আধুনিক নিউটাউনের ইকো পার্কে এই ধরনের একটি পার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট দফতর। পাশাপাশি, উত্তর ২৪ পরগনার খড়দা এবং উত্তরের পাহাড়ি জেলা কালিম্পংয়েও এই পার্ক তৈরির প্রস্তাবটি সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে। মূলত, রাজ্যের মোট ছ’টি ভিন্ন কৃষি-জলবায়ু অঞ্চলে একটি করে এমন মোট ছ’টি পার্ক গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজ্যের আবহাওয়া, ভৌগোলিক উচ্চতা, মাটির প্রকৃতি এবং ভূপ্রকৃতির নানা বৈচিত্র্যের ওপর ভিত্তি করে এই ছ’টি অঞ্চলকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই অঞ্চলগুলি হল—পাহাড়ি অঞ্চল, তরাই ও তিস্তা পলিমাটি অঞ্চল, গাঙ্গেয় (নতুন) পলিমাটি অঞ্চল, বিন্ধ্য (পুরনো) পলিমাটি অঞ্চল, ল্যাটেরাইট ও কাঁকুরে এবড়োখেবড়ো অঞ্চল এবং উপকূলীয় পলিমাটি অঞ্চল।
ফার্ন সংরক্ষণে সরকারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ:
সম্প্রতি প্রায় ২৮টি কেন্দ্রীয় সংস্থার সঙ্গে রাজ্যের ভবিষ্যৎমুখী বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন ও পরিকাঠামো নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের ফাঁকেই রাজ্যের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জৈবপ্রযুক্তির ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তী এই মেগা পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ফার্নের বহু প্রজাতি আজ মারাত্মকভাবে বিপন্ন এবং প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে তাদের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। এই বর্তমান প্রেক্ষাপটে, আমরা রাজ্যের বিভিন্ন কৃষি-জলবায়ু অঞ্চলে পৃথক ফার্ন জীববৈচিত্র্য পার্ক গড়ে তুলে ফার্ন সংরক্ষণের কাজ সফল করতে চাই।”
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ঔষধি গুণাবলীতে ফার্নের গুরুত্ব যে অপরিসীম, সেই প্রসঙ্গটি টেনে মন্ত্রী আরও যোগ করেন, “ফার্ন প্রজাতিগুলি বিভিন্ন ধরনের সেকেন্ডারি মেটাবোলাইটস উৎপাদন করে, যার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নানা বায়োঅ্যাকটিভ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি ভবিষ্যতে বহু জটিল রোগের চিকিৎসায় অত্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হতে পারে।”
কীভাবে এগিয়ে চলবে এই সংরক্ষণ প্রক্রিয়া?
এই সংরক্ষণ প্রকল্পের সঠিক রূপরেখা ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তী জানান, “আমরা যদি রাজ্যের প্রতিটি কৃষি-জলবায়ু অঞ্চলে অন্তত একটি করে ফার্ন জীববৈচিত্র্য পার্ক স্থাপন করতে পারি এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ‘ইন-সিটু’ (প্রাকৃতিক আবাসে) সংরক্ষণের জোরালো উদ্যোগ নিতে পারি, তবে এই দুর্লভ প্রজাতিগুলিকে আরও অনেক বেশি কার্যকরভাবে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।”
পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের উদ্যোগ একেবারে প্রথম:
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে এবং দক্ষিণ ভারতের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে এই ধরনের বিশেষ পার্কের প্রচলন বেশ জনপ্রিয় হলেও, পশ্চিমবঙ্গে ফার্ন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এমন সুপরিকল্পিত উদ্যোগ এই প্রথম নেওয়া হলো। ফার্ন পার্ক নির্মাণের পাশাপাশি রাজ্যের ছাত্রছাত্রী ও যুবসমাজর মধ্যে মহাকাশ বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বাড়াতেও সমানভাবে উদ্যোগী হয়েছে রাজ্য প্রশাসন। ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দফতর নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে একটি আধুনিক ‘অ্যাস্ট্রো পার্ক’ বা মহাকাশ গবেষণা ও প্রদর্শন পার্ক তৈরির জন্য উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করেছে। ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজিয়ামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রেখেই এই বিশেষ পার্কটি তৈরি করা হবে।
রাজ্যের সার্বিক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও উন্নয়নের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে মন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তী বলেন, “রাজ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং জৈবপ্রযুক্তির উত্তরোত্তর উন্নতির স্বার্থে আমরা কেন্দ্র সরকার এবং দেশের সমস্ত শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে যৌথভাবে হাত মিলিয়ে একযোগে কাজ করব।”