‘কালীঘাট তৃণমূল’ বনাম ‘ঋতব্রত তৃণমূল’! প্রতীক কার? কমিশনকে চিঠি দিয়ে বড় দাবি মমতার!

রাজ্য রাজনীতির আঙিনায় বর্তমানে এক চরম ও অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে, যার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের আধিপত্য এবং জোড়াফুল প্রতীকের আইনি দখলদারি। তৃণমূল কার—এই সুনির্দিষ্ট প্রশ্নটিকে সামনে রেখে বর্তমানে দলটির অন্দরে দুটি ভিন্ন শিবির মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সুপ্রতিষ্ঠিত ‘কালীঘাট তৃণমূল’ শিবির এবং অন্যদিকে ঋতব্রতের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিক্ষুব্ধ বা বিদ্রোহী ‘ঋতব্রত তৃণমূল’ শিবির। এই দুই বিবদমান শিবিরের রাজনৈতিক দ্বৈরথ এখন কেবল রাজ্যস্তরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা গড়ায় গড়ায় সোজা গিয়ে পৌঁছেছে দেশের নির্বাচন কমিশনের দোরগোড়ায়। জোড়াফুল প্রতীক এবং দলীয় পরিচয়ের বৈধ অধিকার কার হাতে থাকবে, সেই অমীমাংসিত আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের দ্রুত ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দাবি জানিয়ে এবার সরাসরি নির্বাচন কমিশনকে কড়া ভাষায় চিঠি দিয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

কমিশনের কাছে পাঠানো সেই পত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, দলের প্রতীক ও অধিকার নিয়ে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবি পেশ করার জন্য গত ৬ জুলাই পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ডেডলাইন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। কমিশনের সেই নির্দেশিকা মেনে যথাসময়েই তাঁর নেতৃত্বাধীন শিবির চিঠির লিখিত ও তথ্যভিত্তিক জবাব জমা দিয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে বিরোধী ‘ঋতব্রত তৃণমূল’ শিবির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো উত্তর দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এমনকি তাদের অপারগতার কথা বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশন স্বয়ং উদ্যোগী হয়ে পরবর্তীতে আরও দু’বার অতিরিক্ত সময়সীমা বাড়িয়ে দিলেও বিদ্রোহী শিবির কোনো সদুত্তর দাখিল করতে পারেনি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর জোরালো যুক্তি, বিরোধী শিবির নির্ধারিত ডেডলাইনের মধ্যে কোনো জবাব দিতে না পারার অর্থই হলো তারা পরোক্ষভাবে কালীঘাট শিবিরের সমস্ত দাবি ও আধিপত্য নিঃশর্তে মেনে নিয়েছে।

এই পরিস্থিতির দ্রুত এবং আইনসিদ্ধ অবসান চেয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই জলজ্যান্ত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের আবহেই গত ১৭ জুলাই নয়াদিল্লিতে দেশের সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। সেই জমজমাট সাংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের দুই শিবিরের এই তীব্র অন্তর্কলহ ও নির্বাচন কমিশনের দোরগোড়ায় গড়ানো বিবাদ নিয়ে একাধিক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন রাখেন। এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটাই জ্বলন্ত প্রশ্ন তাড়া করে বেড়াচ্ছে—প্রকৃতপক্ষে আসল তৃণমূল কংগ্রেস কোনটি এবং এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের অবসান কবে ঘটবে?

সাংবাদিকদের সেই কঠিন ও সরাসরি প্রশ্নের উত্তরে অবশ্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কোনো চটজলদি ঘোষণা না করে এক রহস্যজনক কৌতুহল বজায় রেখেছেন। তিনি অত্যন্ত সোজাসাপ্টা ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, ব্যক্তিগতভাবে তিনি জানেন না কে আসল তৃণমূল। তবে তিনি দেশবাসীকে সম্পূর্ণ আশ্বস্ত করে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণভাবে দেশের সংবিধান ও নির্দিষ্ট আইনসম্মত বিধি মেনেই তাদের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ফলে, শত রাজনৈতিক জল্পনা ও চিঠিপত্রের লড়াই চললেও, প্রকৃত ‘আসল’ তৃণমূল কে, সেই আইনি সিলমোহর বসানোর চূড়ান্ত ঘোষণা এখনই আসছে না। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের এই নিরপেক্ষ অথচ রহস্যময় অবস্থানে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনার পারদ হু হু করে চড়ে গিয়েছে। আগামী দিনে নির্বাচন কমিশন এই জটিল রাজনৈতিক ও প্রতীকের লড়াইয়ে ঠিক কী ধরনের সাংবিধানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই এখন গোটা দেশের রাজনৈতিক মহলের নজর আটকে রয়েছে।