ভারী ব্যায়াম ছাড়াই ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখুন! খাবার খাওয়ার পর এই নিয়ম মানলেই মিলবে দুর্দান্ত ফল

খাওয়ার পর একটু হাঁটার পরামর্শ চিকিৎসকদের কাছে অত্যন্ত পুরনো ও পরিচিত হলেও, সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণা এবং বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত বলছে যে এই সাধারণ অভ্যাসটি রক্তে শর্করার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের শরীরে প্রিডায়াবেটিস, টাইপ-২ ডায়াবেটিস কিংবা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের মতো জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে খাবারের পরপরই অল্প সময় ধরে হাঁটা অবিশ্বাস্য রকমের উপকারী হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, যেকোনো ভারী বা হালকা খাবার খাওয়ার প্রায় ৩০ থেকে ৯০ মিনিটের মধ্যে মানবদেহের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা সবথেকে বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। এই নির্দিষ্ট সময়টিতে শরীরচর্চা বা সামান্য হাঁটাচলা করলে শরীরের পেশিগুলি সরাসরি রক্ত থেকে গ্লুকোজ শুষে নিয়ে তা শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এর ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ করে লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পাওয়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং শরীরের ইনসুলিনের কার্যকারিতাও প্রভূত পরিমাণে উন্নত হয়। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এর জন্য কোনো ধরনের ভারী বা জিম-ভিত্তিক কসরতের বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই।
খাবার শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট অত্যন্ত হালকা গতিতে হাঁটলেই শরীরে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়। এমনকি ব্যস্ততার কারণে যাঁদের হাতে একেবারেই সময় থাকে না, তাঁরা যদি মাত্র ২ থেকে ৫ মিনিটও হাঁটেন, তাহলেও রক্তে শর্করার ক্ষতিকর মাত্রা কমাতে দারুণ সাহায্য মিলতে পারে। বিভিন্ন সাম্প্রতিক গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে যে, দিনের যেকোনো এক সময়ে একটানা ৩০ মিনিট হাঁটার চেয়ে প্রতিটি প্রধান খাবারের ঠিক পরেই ১০ মিনিট করে হাঁটা শরীরের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে অনেক বেশি ফলদায়ী প্রমাণিত হয়।
খাওয়ার পরপরই এই নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস শুধু রক্তে শর্করা বা সুগার নিয়ন্ত্রণেই সহায়তা করে না, বরং খাবার দ্রুত হজম করার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। চিকিৎসকদের মতে, খাবার খেয়ে হাঁটাচলা করলে অন্ত্রের স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ নড়াচড়া বৃদ্ধি পায়, যার ফলে খেয়ে ওঠার পর খাবার অত্যন্ত দ্রুত হজম হতে সাহায্য করে। বহু মানুষের ক্ষেত্রেই খাবার পর পেট ফাঁপা, অতিরিক্ত গ্যাস জমে যাওয়া কিংবা ভারী লাগার বিরক্তিকর সমস্যা থেকেও মুক্তি মেলে। পাশাপাশি, অনেকেই দুপুরের বা রাতের ভারী খাবার খাওয়ার পর যে চরম ঝিমুনি বা এনার্জি ক্র্যাশ অনুভব করেন, সেটিও এই অভ্যাসের ফলে অনেকাংশেই কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের জোরালো পরামর্শ হলো, খাবার শেষ করার পর যত দ্রুত সম্ভব, অর্থাৎ প্রথম ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই হালকা গতিতে হাঁটা শুরু করা সবচেয়ে বেশি ফলদায়ী। তবে মনে রাখতে হবে যে এই হাঁটার গতি যেন সবসময় সম্পূর্ণ আরামদায়ক এবং স্বাভাবিক হয়। কোনো অবস্থাতেই দ্রুত দৌড়ানো বা উচ্চমাত্রার কোনো কার্ডিও ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই। তবে এই সাধারণ স্বাস্থ্যকর অভ্যাসটি কোনোভাবেই চিকিৎসকের দেওয়া ডায়াবেটিসের নিয়মিত ওষুধপত্র, চিকিৎসা পদ্ধতি কিংবা সুষম খাদ্যতালিকার কোনো বিকল্প হতে পারে না।
যাঁদের ইতিমধ্যেই ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো গুরুতর শারীরিক জটিলতা রয়েছে, তাঁরা এই ধরনের নতুন কোনো হাঁটার বা শরীরচর্চার অভ্যাস শুরু করার আগে অবশ্যই নিজেদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গোটা প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিয়ম ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। প্রতিদিন নিয়মিতভাবে খাবারের পর মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটার মতো এই ছোট্ট একটি জীবনযাত্রার পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদে আপনার গোটা শরীরের সুস্থতার জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।