ঘরে ঘরে ইউজ করা জনসনের বেবি পাউডার কি ক্যানসারের কারণ? আমেরিকা বনাম ভারতের ভয়ঙ্কর সত্য জানলে আঁতকে উঠবেন!

দশক ধরে ভারতীয় পরিবারগুলিতে জনসন অ্যান্ড জনসনের বেবি পাউডার অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ঘরের অতি পরিচিত একটি শিশু যত্ন সামগ্রী। মৃদু ত্বকের উপযোগী পণ্য হিসেবে এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অভিভাবকদের প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছে। তবে, ট্যাল্ক-ভিত্তিক এই পাউডারে অ্যাসবেস্টসের মতো ক্ষতিকারক পদার্থ—যা ক্যানসারের কারণ হতে পারে—থাকতে পারে এবং এর দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে এক তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। আমেরিকায় এই বিতর্ক এক বিশাল রূপ নিলেও ভারতের চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ভারতে এই বিষয়টি মূলত আইনি লড়াই বা বিশাল ক্ষতিপূরণের মামলার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়াকড়ি, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং উৎপাদন মান নিয়ে আদালতের আইনি পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল।

আমেরিকায় এই বিতর্কটি দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম পণ্য দায়বদ্ধতা বা প্রোডাক্ট লায়াবিলিটি মামলায় পরিণত হয়। বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার নারী জনসন অ্যান্ড জনসনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। তাঁদের মূল অভিযোগ ছিল, দীর্ঘকাল ধরে এই ট্যাল্ক-ভিত্তিক বেবি পাউডার ব্যবহারের ফলে অ্যাসবেস্টস দূষণের কারণে ডিম্বাশয়ের ক্যানসার বা মেসোথেলিওমা হয়েছে। কোম্পানি বরাবরই এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে দাবি করেছে যে তাদের ট্যাল্ক পণ্যগুলি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং অ্যাসবেস্টসমুক্ত। আমেরিকার বিভিন্ন জুরি মামলার রায়ে ক্ষতিপূরণ হিসেবে কয়েক মিলিয়ন ও বিলিয়ন ডলার প্রদানের নির্দেশ দেন, যদিও কিছু রায় পরবর্তীতে আপিলে হ্রাস বা খারিজ করা হয়। এই আইনি ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে জনসন অ্যান্ড জনসন প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল সমঝোতার প্রস্তাবও দিয়েছিল। তবে দেউলিয়া সংক্রান্ত নীতির জেরে আমেরিকার আদালত সেই প্রস্তাব খারিজ করে দেয়। ফলস্বরূপ, ভোগ্যপণ্য সংক্রান্ত আইনি লড়াইগুলির মধ্যে এটি অন্যতম ব্যয়বহুল মামলা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

ভারতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটে ২০২২ সালে। মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন বা এফডিএ (FDA) মুলুন্ড কারখানায় উৎপাদিত জনসন অ্যান্ড জনসনের বেবি পাউডারের উৎপাদন লাইসেন্স বাতিল করে দেয়। সরকারি পরীক্ষাগারে ওই পণ্যের নমুনা ‘মানের দিক থেকে উপযুক্ত নয়’ বলে প্রমাণিত হওয়ার পরই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোম্পানিটিকে এই পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রি অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে বোম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় জনসন অ্যান্ড জনসন। কোম্পানির জোরালো যুক্তি ছিল, পরীক্ষাগারের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং পরীক্ষার ফলগুলি কোনোভাবেই নির্ভরযোগ্য নয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বোম্বে হাইকোর্ট এফডিএ-র নির্দেশ খারিজ করে দেয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপে গুরুতর ত্রুটি খুঁজে পাওয়ার পর কোম্পানিকে বেবি পাউডার উৎপাদন ও বিক্রির অনুমতি বহাল রাখে। এই মামলাটিই ভারতে এই পণ্য সংক্রান্ত সবচেয়ে বড় আইনি লড়াইয়ে পরিণত হয়।

জাতীয় স্তরে তদন্তের ক্ষেত্রে, আন্তর্জাতিক স্তরে টেল্ক ও অ্যাসবেস্টস দূষণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে ভারতের ড্রাগ রেগুলেটরও দেশে বিক্রিত জনসন বেবি পাউডার তৈরির উপাদানের বিশদ বিবরণ তলব করে। আমেরিকার মতো এখানে হাজার হাজার ক্রেতার ক্যানসার হওয়ার অভিযোগ নিয়ে কোনো বিচার হয়নি; বরং লাইসেন্স বাতিল, ল্যাবরেটরি পরীক্ষার পদ্ধতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা যথাযথ নিয়ম মেনেছিল কি না, তার ওপরই আইনি বিতর্ক কেন্দ্রীভূত ছিল। হাইকোর্ট শেষ পর্যন্ত মহারাষ্ট্র এফডিএ-র নির্দেশ খারিজ করে কোম্পানির পক্ষেই রায় দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনসন অ্যান্ড জনসনের বেবি পাউডার বিতর্কটি ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল পণ্য দায়বদ্ধতা মামলায় রূপ নিয়েছিল, যেখানে ট্যাল্ক-ভিত্তিক পাউডার ব্যবহারে ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগে হাজার হাজার নারী বহু বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ চেয়ে আইনি লড়াইতে নেমেছিলেন এবং কোম্পানিকে দেউলিয়া নীতির সাহায্যও নিতে হয়েছিল। অন্যদিকে, ভারতের চিত্রটি সম্পূর্ণ আলাদা; এখানে কোনো ব্যাপক ব্যক্তিগত আঘাতের মামলা বা ক্ষতিপূরণের দাবি উঠেনি। ভারতের পুরো বিতর্কটি সীমাবদ্ধ ছিল প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপে, যার ফলে শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে কোম্পানি উৎপাদন ও বিক্রির অনুমতি বজায় রাখতে সক্ষম হয়।