সরকারি সাহায্য পৌঁছানোর আগেই ত্রাতা দিনমজুর! বন্যায় ডুবে যাওয়া গ্রামে অবিশ্বাস্য সাহসিকতায় বাঁচল ২০০০ প্রাণ!

প্রকৃতির এক ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর রোষানলে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্য আসাম। গত ১৯ জুলাই দিখৌ নদীর ভয়ংকর বন্যায় জলের তলায় তলিয়ে গেছে রাজ্যের একাধিক গ্রাম। এর জেরে নাজিরা মহকুমার বিস্তীর্ণ অঞ্চল সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে এবং বিস্তীর্ণ এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই চরম বিপদের মুখে যখন কোনো সরকারি বা পেশাদার উদ্ধারকারী দল দুর্গত এলাকায় এসে পৌঁছাতে পারেনি, ঠিক সেই সময় ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এক সাধারণ দিনমজুর—যার নাম শ্রাবণ কুমার।

বয়সে তরুণ, মাত্র ২৫ বছর বয়স তাঁর। জীবনের কঠিন বাস্তবতার কারণে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ পেলেও নদীমাতৃক আসামের জলপথের প্রতিটি বাঁক ও নদীপ্রকৃতি তাঁর অত্যন্ত চেনা। বন্যার ভয়াল রূপ ও তার ধ্বংসলীলা দেখেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আসন্ন বিপদের তীব্রতা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। নিজের বাড়িও যখন সর্বগ্রাসী জলের তলায় সম্পূর্ণ জলমগ্ন, তখনো তিনি ভয়ে গুটিয়ে থাকেননি। বরং সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে রাজকুমার রাজগার ও মামু দাস-সহ স্থানীয় কয়েকজন সাহসী তরুণকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মাত্র ছ’টি সাধারণ দেশি নৌকা (যা স্থানীয়ভাবে ‘তুলুঙ্গা নাও’ নামে পরিচিত) নিয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন।

কোনো ধরনের আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম বা পেশাদার প্রশিক্ষণ ছাড়াই এই অসমসাহসিক অভিযানে নেমেছিলেন শ্রাবণ ও তাঁর সঙ্গীরা। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত এবং প্রবল স্রোতের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে তাঁরা একে একে উদ্ধার করেন বহু শিশু, গর্ভবতী মহিলা এবং বয়স্ক মানুষদের। জলমগ্ন ঘরের ছাদের ফাঁক ও সিলিং ভেঙে বহু মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনেন এই তরুণদের নিবেদিতপ্রাণ দল। একটানা অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রায় ৫টি গ্রামের প্রায় ২,০০০ মানুষের অমূল্য জীবন বাঁচিয়ে তাঁরা প্রমাণ করে দিয়েছেন যে মানবিকতার কাছে যে কোনো প্রতিকূলতাই হার মানতে বাধ্য।

যদিও এই মহৎ উদ্ধারকাজের জন্য চরম মূল্যও চোকাতে হয়েছে তরুণ দিনমজুর শ্রাবণকে। উদ্ধারকাজ সফলভাবে শেষ করে যখন তিনি নিজের ঠিকানায় ফিরে আসেন, তখন তিনি দেখেন যে সর্বগ্রাসী জলের তোড়ে তাঁর নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও ভেসে গিয়েছে। সর্বস্ব হারিয়েও তাঁর মুখে কোনো আক্ষেপ নেই। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষদের উদ্দেশ্যে তাঁর একটাই শক্তিশালী বার্তা—প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই নিত্যদিনের মোকাবিলায় প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যের সাঁতার জানা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে এই তরুণদের এমন অসাধারণ ও দুঃসাহসিক কাজ দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের এনডিআরএফ-এর মতো পেশাদার বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করে কুর্নিশ জানিয়েছেন।