কর্ণাটকে ৫০০ দিনের কৃষক আন্দোলন! সিঙ্গুরের ছায়া দেখে জমি বাঁচাতে এবার আসরে জেন-জি!

বুধবার ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল কর্নাটকের বিদারী অঞ্চল। সরকারের বিতর্কিত জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কৃষকদের লাগাতার অবস্থান ও ধর্ণা আন্দোলনের আজ সফলভাবে ৫০০ দিন পূর্ণ হলো। সরকারের এই কঠোর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে বাধ্য করার জন্য এবার আন্দোলনরত কৃষকরা সরাসরি ‘জেন-জি’ অর্থাৎ দেশের উদীয়মান তরুণ ও যুবসমাজকে তাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। শুধু যুবসমাজই নয়, এর পাশাপাশি চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকেও তাদের এই অস্তিত্বের লড়াইয়ে শামিল হওয়ার জোরালো আর্জি জানানো হয়েছে। কৃষকদের স্পষ্ট বক্তব্য, সিঙ্গুর কিংবা নিউ টাউনের মতোই এই উর্বর জমি বাঁচাতেই হবে।

বেঙ্গালুরু থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিদারীতে একটি বিশাল নতুন উপনগরী বা স্যাটেলাইট টাউনশিপ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে কর্ণাটক সরকার প্রায় ১০ হাজার একর উর্বর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। স্থানীয় জমির মালিক ও কৃষকদের জোরালো দাবি, এই অঞ্চলের জমি অত্যন্ত উর্বর এবং এখান থেকে বছরে চারবার সফলভাবে ফসল উৎপাদিত হয়। উল্লেখ্য, এই উপনগরী তৈরির মূল সিদ্ধান্তটি বিগত দিনে বিজেপি সরকারের আমলেই নেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান কংগ্রেস সরকার এখনও পর্যন্ত আন্দোলনরত কৃষকদের দমনে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বলপ্রয়োগের পথে হাঁটেনি, যার ফলে কৃষকরা শান্তিপূর্ণভাবে জমি আগলে দীর্ঘ ৫০০ দিন ধরে তাদের ধর্না আন্দোলন সফলভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন।

কৃষকদের এই ন্যায়সংগত আন্দোলনের সমর্থনে ইতিমধ্যেই ময়দানে নেমে পড়েছে পরিবেশ রক্ষায় নিয়োজিত একাধিক বিশিষ্ট সংগঠন। পরিবেশবিদদের পরিচালিত এক বিশদ সমীক্ষায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যে, প্রস্তাবিত ওই নির্দিষ্ট এলাকায় অন্তত ১০ লক্ষ পূর্ণবয়স্ক গাছ রয়েছে। সেখানে যদি পরিকল্পিত উপনগরী গড়ে ওঠে, তবে বেঙ্গালুরুর মতো মেগাসিটিতে বায়ুদূষণ এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের সমস্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। এই ভয়াবহ পরিণতির কথা মাথায় রেখেই পরিবেশপ্রেমী সংগঠনগুলি সমগ্র নগরবাসীকে এই জনআন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামিল হওয়ার জোরালো আবেদন জানিয়েছে।

আন্দোলনকে আরও সুসংগঠিত ও তীব্র করে তুলতে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে ‘বিদারী রাইথা হারাথা’ অর্থাৎ শক্তিশালী বিদারী কৃষক আন্দোলন মঞ্চ। আন্দোলনরত কৃষকরা বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার ও লিফলেট ছড়িয়ে দিয়েছেন, যেখানে কন্নড় ভাষায় লেখা রয়েছে—’জেন-জি রাশিদা মাক্কালে, নিম্মা সময়া এগা বনদিদে’, যার অর্থ হলো—’হে কৃষকের সন্তানেরা, এবার তোমাদের এগিয়ে আসার সঠিক সময় এসেছে!’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সম্প্রতি দিল্লির আলোচিত নিট (NEET) দুর্নীতি ইস্যুতে ছাত্র ও যুবসমাজ যেভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই চালিয়েছে, সেই সাফল্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই কর্ণাটকের কৃষকরাও তাদের উর্বর জমি রক্ষা করতে এখন তরুণ প্রজন্মের ওপর ভরসা রাখছেন।

কৃষকদের এই জীবন-মরণের লড়াইয়ে সমাজের সব স্তর থেকে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চলছে। প্রচারপত্রগুলিতে তরুণ প্রজন্মকে স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, আজকের দিনে যে সমস্ত কৃতি প্রকৌশলী বা চিকিৎসকরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, তাঁদের শেকড় বা পরিবার বহুক্ষেত্রেই এই কৃষি জমির সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। কৃষিকাজ যে কর্ণাটকের সমগ্র অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তি, তা প্রচারের মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে। কৃষকদের সাফ কথা, যারা সরাসরি চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁরাও নানাভাবে এই অন্নদাতাদের দ্বারাই উপকৃত হন। তাই খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতেই জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষকে আজ ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।