ভারতের ওপর ১০০% শুল্ক চাপানোর তোড়জোড়! মার্কিন সেনেটের এই পদক্ষেপে কি বড় বিপাকে পড়বে দিল্লি?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনেট এমন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিল আলোচনার জন্য অনুমোদন করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের ওপর এক বিশাল ও গভীর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। মঙ্গলবার মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ রাশিয়ার তেল ও গ্যাস বিক্রি থেকে অর্জিত বিশাল আয়ের ওপর কঠোর ও কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা আরোপ সম্বলিত একটি বিতর্কিত বিলকে আলোচনার জন্য প্রাথমিক সবুজ সংকেত দিয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আলোচনার জন্য এই প্রাথমিক অনুমোদন হলো মূলত বিল পাসের দীর্ঘ পথের প্রথম বড় পদক্ষেপ। যদি শেষ পর্যন্ত এই বিলটি মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ বা হাউসেও পাস হয়ে যায়, তবে তা সরাসরি দেশের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার পরিধি ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি করবে। এর ফলে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি কেনা ভারতের মতো প্রধান দেশগুলির ওপর এক ধাক্কায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া শুল্ক আরোপ করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা মার্কিন প্রশাসনের হাতে চলে আসবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি রাশিয়ার সঙ্গে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যেই ওয়াশিংটনে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন এবং ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও আগ্রাসী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার তীব্র দাবি জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিলটি নিয়ে সেনেটে আলোচনা আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্থাৎ ৮৬টি ভোট পড়েছে এবং এর বিপক্ষে মাত্র ১২টি ভোট পড়েছিল। এই ভোটাভুটির মাধ্যমেই বিলটির প্রাথমিক আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হলো। তবে আইন হিসেবে পূর্ণতা পাওয়ার আগে এটিকে আরও দীর্ঘ আলোচনা এবং চূড়ান্ত ভোটাভুটির মুখোমুখি হতে হবে। এই সম্ভাব্য আইনটির মূল লক্ষ্য হলো ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার সামরিক আক্রমণের জেরে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। এই খসড়া বিলে শুধুমাত্র রুশ শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাই নয়, বরং ভারত, চিন, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি এবং আজারবাইজানের মতো দেশগুলির ওপর অত্যন্ত চড়া শুল্ক চাপানোর কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সস্তায় রুশ জ্বালানির ওপর এই উদীয়মান অর্থনীতিগুলির নির্ভরশীলতা চিরতরে কমানো এবং রাশিয়ার তেল রপ্তানি-নির্ভর জাতীয় আয়ের উৎসের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করা।
রাশিয়ার ওপর এমন কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের এই প্রস্তাবিত বিলটি ঠিক এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এসেছে, যখন বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিম এশিয়ার ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা এক নতুন সঙ্কটের মুখে পড়েছে। ওই অঞ্চলের এই যুদ্ধের জেরে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক নৌচলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনার ফলে প্রধান উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ শৃঙ্খলেও চরম বিঘ্ন ঘটেছে। অথচ অতীতে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই আসত ঐতিহ্যগতভাবে ওই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকেই। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি ও জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ভারতীয় তেল পরিশোধন ও বিপণন কোম্পানিগুলিকে বাধ্য হয়েই তাদের তেলের প্রধান বিকল্প উৎস হিসেবে রাশিয়ার সস্তার অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর ব্যাপক মাত্রায় নির্ভর করতে হয়েছে।
উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর আগে প্রথমবার ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি বাণিজ্যের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। সেই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের আমদানিকৃত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার আকস্মিক ঘোষণা করেছিলেন। সেই সময়েও ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সরাসরি অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় তেল কিনে প্রকারান্তরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ প্রচেষ্টাকেই পরোক্ষভাবে রসদ জুগিয়ে চলেছে। বর্তমানের এই নতুন বিলটি সেই পুরনো চাপকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা।