লাইমলাইটের আড়ালে মহৎ উদ্যোগ! অসমের ভয়াবহ বন্যায় লক্ষ মানুষের ত্রাতা হয়ে কীভাবে সামনে এলেন সলমন খান?

অসমের বর্তমান ভয়াবহ ও প্রলয়ঙ্করী বন্যায় যখন রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে সম্পূর্ণ ঘরছাড়া এবং অসহায় জীবন কাটাচ্ছেন, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে দুর্গতদের পাশে ত্রাণ ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন বলিউডের জনপ্রিয় সুপারস্টার সলমন খান। প্রচারের আলো থেকে সম্পূর্ণ দূরে থেকে তাঁর বিশ্বখ্যাত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘বিং হিউম্যান’ (Being Human)-এর পক্ষ থেকে রাজ্যজুড়ে এক বিরাট মাপের ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। স্থানীয় একটি বিশিষ্ট ফ্যান ক্লাবের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বর্তমানে ধাপে ধাপে অসমের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সাধারণ মানুষের হাতে খাবার, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এবং অন্যান্য অত্যন্ত জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই ব্যাপক ত্রাণ অভিযানটি মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন করা হবে। এই কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে বন্যাকবলিত এলাকার দুর্গত মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে রেডি-টু-ইট খাবারের প্যাকেট এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিতরণ শুরু করা হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় ও পরবর্তী ধাপগুলিতে দুর্গতদের হাতে প্রয়োজনীয় রেশন সামগ্রী, বিশুদ্ধ পানীয় জল, জীবনদায়ী ওষুধ, স্যানিটারি ন্যাপকিন এবং মশা তাড়ানোর কার্যকর স্প্রে-সহ বিভিন্ন অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্র তুলে দেওয়া হবে। শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ বিতরণই নয়, এর পাশাপাশি এই ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বিভিন্ন স্কুল এবং গ্রামীণ হাসপাতালগুলোর পুনর্গঠন ও সংস্কারের কাজেও আর্থিক ও পরিকাঠামোগত সাহায্য করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে সলমনের সংস্থার।
অসমের এই ভয়াল বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে দেশের বহু বলিউড তারকা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব সামাজিক মাধ্যমগুলিতে নামমাত্র উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, সলমন খান সরাসরি মাঠে নেমে যেভাবে ত্রাণ কার্যক্রমে সামিল হয়েছেন, তার এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ বিশেষভাবে সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। এর আগে অভিনেত্রী ভূমি পেডনেকর এবং গুণী অভিনেতা আদিল হুসেনও অসমের বন্যাদুর্গতদের পাশে থাকার জোরালো বার্তা দিয়েছিলেন। তবে সরাসরি দুর্গতদের দোরগোড়ায় গিয়ে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার এমন নজির খুব কম তারকাই স্থাপন করেছেন।
এদিকে, অসমে বিগত কয়েকদিনের লাগাতার বৃষ্টি ও বন্যায় পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। সরকারি সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখনও পর্যন্ত মোট ৬৮ জন মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। যদিও নদনদীর জলস্তর কিছুটা কমতে শুরু করায় সার্বিক পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে। কয়েকদিন আগেও যেখানে রাজ্যের প্রায় ৫ লক্ষের বেশি মানুষ ভয়াবহ বন্যার কবলে বন্দি ছিলেন, বর্তমানে সেই দুর্গত মানুষের সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লক্ষ ৪৫ হাজারে।
অসম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (ASDMA)-র প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের শিবসাগর, গোলাঘাট, চরাইদেও, যোরহাট, নগাঁও এবং কামরূপ মেট্রোপলিটন-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জেলার মোট ৪,৪৫,৪৯৫ জন মানুষ এখনও বন্যার মারাত্মক প্রভাবের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। রাজ্যের অন্তত ৬৩১টি গ্রাম এখনও জলের নিচে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চরাইদেও জেলা, যেখানে প্রায় ১.৮৮ লক্ষ মানুষ চরম দুর্দশার মধ্যে জীবন যাপন করছেন। পাশাপাশি, শিবসাগর জেলাতেও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১.৪৪ লক্ষের বেশি ছাড়িয়ে গেছে।
এই প্রলয়ঙ্করী বন্যার জেরে রাজ্যের প্রায় ৩৭ হাজার হেক্টরেরও বেশি উর্বর কৃষিজমি সম্পূর্ণ জলের তলায় চলে গেছে। এর ফলে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২.৫৬ লক্ষের বেশি গৃহপালিত গবাদি পশু এবং জলের স্রোতে ভেসে গেছে ২৬ হাজারেরও বেশি গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি। বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ ও শহুরে রাস্তাঘাট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, জলের তোড়ে ভেঙে পড়েছে ১৭১টি আস্ত পাকা ও কাঁচা বাড়ি এবং আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও ৪,৬৬৭টি আবাসিক বাড়ি। বিশেষ করে শিবসাগর ও যোরহাট জেলার একাধিক সরকারি ও বেসরকারি স্কুলেও বন্যার জল ঢুকে পড়ায় ছাত্রছাত্রীদের পঠনপাঠন দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ধংসিরি নদীর দক্ষিণ শাখা নুমালীগড় এলাকায় এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা কিছুটা হলেও উদ্বেগের কারণ। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, রাজ্যের অন্য কোনো নদী বর্তমানে তাদের সর্বোচ্চ বন্যা স্তর অতিক্রম করেনি। তা সত্ত্বেও হাজার হাজার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দুর্ভোগের মেঘ এখনও কাটেনি। আর এই চরম অনিশ্চয়তা ও কঠিন বিপদের দিনে বলিউড সুপারস্টার সলমন খান ও তাঁর সংস্থার এই মানবিক ত্রাণ উদ্যোগ অসমের বন্যাদুর্গত সাধারণ মানুষের কাছে অন্ধকারের মাঝে এক উজ্জ্বল আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে।