“আমার শুধু একটি সুযোগ দরকার!” আইআইটি কানপুরের ওয়েবসাইট হ্যাক করে কোন যুগান্তকারী বার্তা দিলেন তরুণ?

আইআইটি কানপুরের (IIT Kanpur) অফিসিয়াল ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়ার পর পেজে জ্বলজ্বল করছিল একটিমাত্র চাঞ্চল্যকর বার্তা— “আমার শুধু একটি সুযোগ দরকার”। বিটেক সাইবার সিকিউরিটি (BTech Cyber Security) কোর্সে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে ক্ষোভে এবং নিজের কারিগরি দক্ষতা প্রমাণ করতেই সরাসরি দেশের এই শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট হ্যাক করে বসেছিলেন এক তরুণ পড়ুয়া। তবে এই গুরুতর অপরাধের জন্য কোনও আইনি পদক্ষেপ বা এফআইআর (FIR) করার পথে হাঁটেননি কর্তৃপক্ষ। উল্টো ওই তরুণের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে এবং তাঁর সুপ্ত প্রতিভাকে সঠিক দিশা দেখাতে তাঁকে নিজেদের সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারে ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা শুরু করেছে আইআইটি কানপুর।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে যখন ওই তরুণ আইআইটিতে সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে পড়ার তীব্র ইচ্ছে প্রকাশ করলেও ভর্তির প্রাথমিক বাছাই প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এর পরেই প্রতিষ্ঠানের সাইবার সুরক্ষার লাইভ সিস্টেমে গলদ খুঁজে বের করে ওয়েবসাইটটি হ্যাক করেন তিনি। ওয়েবসাইট হ্যাক করার পর কম্পিউটারের স্ক্রিনে মেসেজ ভেসে ওঠে: “Site is Hacked, All I Need Is Just a Fair Chance” (সাইটটি হ্যাক করা হয়েছে, আমার শুধু একটি ন্যায্য সুযোগ প্রয়োজন)। শুধু ওয়েবসাইট হ্যাক করেই থেমে থাকেননি ওই শিক্ষার্থী; সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স (সাবেক টুইটার) এবং রেডিটে (Reddit) হ্যাকিংয়ের স্ক্রিনশট শেয়ার করে নিজেই এর দায় প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। তবে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন যে, আইআইটি কানপুরের কোনও ধরনের ক্ষতি করা তাঁর বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না। ভর্তি প্রক্রিয়ায় সুযোগ না পেয়ে নিজের সাইবার সুরক্ষার প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রমাণ করতেই তিনি এই বেআইনি পথ বেছে নিয়েছিলেন।
সাধারণত দেশের যেকোনো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে এমন হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটলে সাইবার অপরাধের কড়া ধারায় দ্রুত মামলা দায়ের করা হয়। তবে এই ঘটনার পর আইআইটি কানপুরের ডিরেক্টর মণীন্দ্র আগরওয়াল জানিয়েছেন, প্রথমে তাঁরা পুলিশি এফআইআর বা কঠোর আইনি পদক্ষেপ করার কথা ভাবলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। ওই পড়ুয়ার ব্যতিক্রমী দক্ষতার কথা গভীর বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় যে, তাঁর কাসেম বা কড়া শাস্তি দেওয়া এই মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত হবে না।
ইন্ডিয়া টুডে টিভি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিরেক্টর আগরওয়াল আরও বলেন, “আইআইটি কানপুরের ভর্তি প্রক্রিয়া ইতিপূর্বেই সফলভাবে শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং এর সঙ্গে একাধিক কঠোর আইনি প্রক্রিয়া জড়িত রয়েছে। কিন্তু আমরা কেবল একটা ভুলের জন্য ওই তরুণের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নষ্ট বা বিপন্ন করতে চাইনি। তাই আমরা তাঁকে একটি বিশেষ সুযোগ দেওয়ার কথা ভেবেছি এবং আমাদের প্রধান সাইবার সিকিউরিটি হাব ‘C3iHub’-এ তাঁকে ইন্টার্নশিপ দেওয়ার কথা গভীরভাবে বিবেচনা করছি। তিনি চাইলে আগামী বছর আবার সমস্ত নিয়ম মেনে ভর্তির জন্য চেষ্টা করতে পারেন।”
তবে একই সঙ্গে আইআইটি অধিকর্তা অত্যন্ত কঠোর সুরে সতর্ক করে বলেন, নিজেদের দাবি আদায় বা ক্ষমতা জাহির করার জন্য কোনো দেশের প্রধান প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট বা সিস্টেমে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ করার পদ্ধতিটি একেবারেই গ্রহণযোগ্য বা সমর্থনযোগ্য নয়। অন্যান্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের কাছে এটি যেন কোনো ভুল বার্তা হিসেবে না পৌঁছয়, সে বিষয়েও তিনি বিশেষ সতর্কবার্তা দেন। তিনি যোগ করেন, আইআইটি কানপুরের বিটেক সাইবার সিকিউরিটি কোর্সে ভর্তির সময় হ্যাকাথন-সহ একাধিক সুযোগ দেওয়া হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাঁদের কারিগরি ক্ষমতা তুলে ধরতে পারেন। তাই কোনো অবৈধ পথ না বেছে, আইনি ও নীতিগত ‘এথিক্যাল হ্যাকিং’ এবং সঠিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তরুণদের এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ইন্টারনেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই রেডিট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় চরম আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়ে যায়। নেটিজেনদের একাংশ ওই তরুণের অবিশ্বাস্য এই কারিগরি দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করে মন্তব্য করেন যে, যে সাইবার সিকিউরিটি কোর্সের জন্য শিক্ষার্থী খোঁজা হচ্ছিল, তিনি নিজের কাজের মাধ্যমেই সেই যোগ্যতার জলজ্যান্ত প্রমাণ দিয়েছেন। অন্য একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করে লেখেন, “দেশের বাইরে গেলে এমন অনন্য প্রতিভা দারুণ সুযোগ পেত, দুঃখের বিষয় আমরা এখনও কোটা ব্যবস্থার চক্করে আটকে রয়েছি”। তবে এর বিপরীতে অন্য আরেকটি পক্ষ এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁদের মতে, অসন্তোষ প্রকাশ বা ক্ষমতা দেখানোর জন্য একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সরকারি ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশ করা নৈতিক ও আইনি দিক থেকে সম্পূর্ণ ভুল। একে সমর্থন জানালে ভবিষ্যতে অন্য শিক্ষার্থীরাও নিজের দাবি আদায়ের জন্য বিভিন্ন ওয়েবসাইট হ্যাক করাকে অভ্যাসে পরিণত করবে। সবমিলিয়ে এই ঘটনা বর্তমানে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।