মোর্চার কড়া চাপে কি ঘুরবে পাহাড়ের হাওয়া? আইন ও পঞ্চায়েত মন্ত্রীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সেরে কী বার্তা দিলেন গুরুং?

রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল হতেই উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি রাজনীতিতে এক নতুন ও উত্তাল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। একসময়ে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের সময় তৎকালীন সরকারের আমলে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক পুরনো ও জটিল মামলা এবার সরকারিভাবে প্রত্যাহারের দাবি জোরালো হয়েছে। পুরোনো সমস্ত আইনি গেরো থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে এবং পাহাড়ের সার্বিক উন্নয়নের জোরালো দাবি নিয়ে রাজ্যের মন্ত্রীদের দরবারে হাজির হয়েছেন বিমল গুরুং এবং রোশন গিরি-সহ মোর্চার শীর্ষ নেতৃত্ব। নিজেদের সুনির্দিষ্ট দাবিদাওয়া নিয়ে গত সোমবার থেকেই কলকাতায় ক্যাম্প করে রয়েছেন তাঁরা।

পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের দীর্ঘদিনের জমে থাকা বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে গত সোমবার রাজ্যের আইনমন্ত্রী বিরাজ বিশ্বাসের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসেন মোর্চা নেতৃত্ব। ওই বৈঠকে মূলত গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলিতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পূর্বতন সরকারের আমলে দায়ের হওয়া সমস্ত রাজনৈতিক মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহারের জোরালো দাবি তোলা হয়। এছাড়া বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যবাসীর কাছে ভারতীয় জনতা পার্টি যে সমস্ত বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলি দ্রুত বাস্তবায়িত করারও প্রবল আর্জি জানানো হয়েছে। বৈঠক শেষে মোর্চা নেতৃত্বের তরফে সন্তোষ প্রকাশ করে জানানো হয়েছে যে, আন্দোলনের দিনগুলিতে রাজনৈতিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া এই আইনি মামলাগুলি প্রত্যাহারের আইনি প্রক্রিয়া আগামী এক মাসের মধ্যেই ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই সমস্ত মামলার জেরে দীর্ঘদিন ধরে ঘরছাড়া হয়ে পাহাড়ের বাইরে কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন মোর্চা নেতারা। বর্তমান নতুন সরকারের আমলেই তাঁরা সেই দীর্ঘ আইনি খাঁড়া থেকে স্থায়ী মুক্তি পাওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

আইনমন্ত্রীর সঙ্গে এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকের পর মঙ্গলবার রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের সঙ্গেও একান্ত সাক্ষাৎ করেন বিমল গুরুং ও রোশন গিরি। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক বাদে পাহাড়ে সদ্য পঞ্চায়েত নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নবনির্বাচিত পঞ্চায়েতগুলিকে পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা প্রদান এবং পাহাড়ে প্রায়শই নেমে আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে প্রতিটি পঞ্চায়েতে আলাদা করে শক্তিশালী বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকাঠামো গড়ে তোলার জোরালো দাবি তোলেন তাঁরা। যদিও এই দুই শীর্ষ নেতা সংবাদমাধ্যমের সামনে সরাসরি মুখ খুলে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে চাননি, তবে মোর্চা শিবিরের তরফে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ক্ষমতায়নে তাঁদের দল পুরোপুরি অঙ্গীকারবদ্ধ। অতীতে পাহাড়ের স্বায়ত্তশাসিত পঞ্চায়েত ব্যবস্থা থেকে যে সমস্ত অধিকার ও ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তা অবিলম্বে পুনর্বহাল করার দাবি জানানো হয়েছে। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনকে আরও বেশি ক্ষমতায়িত, দায়িত্বশীল ও জনমুখী করে তোলাই এই মুহূর্তে মোর্চা নেতৃত্বের প্রধান লক্ষ্য, আর সেই উদ্দেশ্যেই রাজ্যের মন্ত্রীদের সঙ্গে এই ধারাবাহিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একসময়ে পাহাড়ের রাজনীতির অবিসংবাদিত ও একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন বিমল গুরুং। কিন্তু গত কয়েক বছরে পাহাড়ের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সমীকরণে অনীত থাপা কিংবা অজয় এডওয়ার্ডদের মতো নতুন নতুন নেতাদের উত্থানের ফলে গুরুংদের রাজনৈতিক রাশ অনেকটাই আলগা হয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পাহাড়ের মাটিতে নিজেদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখতে ও তা পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে মোর্চা শিবির। সেই লক্ষ্যেই পাহাড়ি উন্নয়নের জোরালো তাস খেলে ফের একবার সাধারণ মানুষের মন জয় করতে ও তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছতে চাইছেন বিমল গুরুংরা। রাজ্যের হেভিওয়েট মন্ত্রীদের সঙ্গে এই তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক সেই কৌশলেরই অংশ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।

প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, রাজ্যের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর সঙ্গে মোর্চা নেতাদের এই দফায় দফায় বৈঠক অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ও ইতিবাচক পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। মোর্চা সূত্রে আরও জানা গিয়েছে যে, এই প্রাথমিক বৈঠকের পর আগামী দিনে তাঁরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গেও সাক্ষাতের পরিকল্পনা করেছেন। বিধানসভা নির্বাচনের আগে পাহাড়বাসীর স্বার্থে যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা অবিলম্বে বাস্তবায়িত করার আবেদন নিয়েই তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হতে চলেছেন। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, রাজ্যে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার পর পাহাড়ের রাজনীতির বাতাসে যে বড়সড় বদলের ইঙ্গিত মিলছে, তাতে মোর্চা নেতৃত্বের এই ধারাবাহিক কূটনৈতিক বৈঠক আগামী দিনে রাজ্য সরকারের সঙ্গে পাহাড়ের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন মোড়ে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।