১৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট সিবিআইয়ের! নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে এবার কীসের ইঙ্গিত?

দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেওয়া বহুচর্চিত নিট-ইউজি ২০২৬ (NEET-UG 2026) প্রশ্নফাঁস মামলায় এবার অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI)। চাঞ্চল্যকর এই দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হওয়া মোট ১৩ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও জোরালো তথ্যপ্রমাণসহ আদালতে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট জমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। দেশের লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে এই নজিরবিহীন ছিনিমিনি খেলার ঘটনায় তদন্তের প্রথম পর্যায় থেকেই নড়েচড়ে বসেছিল প্রশাসন, আর এবার চার্জশিট পেশ হওয়ার ফলে এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সিবিআই সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর আওতায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, গুরুতর প্রতারণা, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ এবং তথ্য-প্রমাণ নষ্ট করার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল একাধিক ধারায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এর পাশাপাশি দুর্নীতি দমন আইন এবং পাবলিক এক্সামিনেশন (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিন্স) আইন, ২০২৪-এর বিভিন্ন কঠোর ধারাতেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে। আদালতের বিচার প্রক্রিয়া পোক্ত করতে এই চার্জশিটে দীর্ঘ ৩৬০ জন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীর তালিকা, ৪২২টি গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং ৪৩টি বাজেয়াপ্ত সামগ্রী বা ডিজিটাল আলামত প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে। বর্তমানে এই চাঞ্চল্যকর মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৩ জন অভিযুক্তই বিচারবিভাগীয় হেফাজতে জেলের অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের গত ১৩ মে এই হাই-প্রোফাইল মামলার প্রথম গ্রেফতারিটি নথিভুক্ত করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ তদন্তের জেরে একে একে মোট ১৩ জন কুখ্যাত পাণ্ডাকে পাকড়াও করে সিবিআই। এই ধৃতদের তালিকাটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর, কারণ এর মধ্যে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-র রসায়ন, জীববিজ্ঞান এবং পদার্থবিদ্যার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিন বিষয়ের বিষয় বিশেষজ্ঞরাও রয়েছেন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংগ্রহ এবং তা সুকৌশলে বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত একাধিক কুখ্যাত দালালকেও চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি, দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি কোচিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ওই এনটিএ বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে অত্যন্ত গোপনীয় প্রশ্নপত্র বেআইনিভাবে সংগ্রহের অভিযোগে হাতেনাতে পাকড়াও করা হয়।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, এই সর্বভারতীয় নিট প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ ও সুনির্দিষ্ট জাস্টিসের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র নেতৃত্বে একটি তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। সেই আন্দোলনের প্রবল রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হন দেশের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। দেশজুড়ে পরীক্ষা ব্যবস্থার চরম বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক গাফিলতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ যে অদম্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তার জেরে নড়ে বসে কেন্দ্র। পরবর্তীতে দীর্ঘ আলোচনা ও দেনদরবারের পর কেন্দ্র সরকার বিক্ষোভকারীদের সমস্ত দাবি নিঃশর্তভাবে মেনে নিলে যন্তর মন্তর থেকে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। গোড়া থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছিল যে, এই ভয়ংকর প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত কাউকেই কোনো অবস্থাতেই রেয়াত করা হবে না। ভবিষ্যতে পরীক্ষ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ও সুরক্ষিত করতে আরও অনেক বেশি কঠোর আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে কেন্দ্র। সিবিআইয়ের এই চার্জশিট পেশের পর এখন গোটা দেশের নজর আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ ও বিচার প্রক্রিয়ার দিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।