ট্রাম্পের হুঙ্কারেই কি বদলে গেল হিসাব? ৬০০ ছাড়াল মার্কিন সেনার হতাহতের সংখ্যা, নেপথ্যের কারণ জানলে চমকে উঠবেন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আবহে পেন্টাগন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চাঞ্চল্যকর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, তাদের চলমান হতাহতের তালিকায় একটি সম্পূর্ণ নতুন ও পৃথক বিভাগ তৈরি করা হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা এই মারাত্মক সংঘাতের ঘটনায় নিহত ও আহত মার্কিন সেনাসদস্যদের হিসাব নিখুঁতভাবে আলাদা রাখার জন্যই এই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পেন্টাগনের অন্দরমহল সূত্রে খবর, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর পরিচালিত তৎকালীন সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury), যার নির্ধারিত মেয়াদ ও কার্যক্রম ইতিমধ্যেই সমাপ্ত হয়েছে।

আমেরিকার বিখ্যাত ‘ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেম’ বা ডিসিএএস (DCAS) সূত্রে প্রকাশ, সাম্প্রতিক বিধ্বংসী হামলার ঘটনাগুলোতে নিহত চারজন বীর সেনাসদস্য এবং আহত বহু সেনার নাম তাঁদের পুরোনো আনুষ্ঠানিক ‘ইরান যুদ্ধ’ সংক্রান্ত তালিকা থেকে অত্যন্ত সুকৌশলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিবর্তে তাঁদের ‘ওভারসিজ অপারেশনস’ বা বিদেশি অভিযান নামের একটি সম্পূর্ণ নতুন বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং নবগঠিত এই বিভাগের তালিকাভুক্ত সেনাসদস্যদের সম্মিলিত সংখ্যা যোগ করলে এই সর্বগ্রাসী সংঘাতে আহত মার্কিন সেনার মোট সংখ্যা এক ধাক্কায় ৬৪২ জনে গিয়ে ঠেকেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সঙ্গে চলা এই চলমান সামরিক সংঘাতকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত সচেতনভাবে গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ইজরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে শুরু হওয়া পূর্ববর্তী যুদ্ধের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখতে নারাজ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এটিকে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও নতুন সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পেন্টাগনের বর্তমান এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও তালিকা পরিবর্তনের পদক্ষেপটি মূলত ট্রাম্পের সেই ঘোষিত রাজনৈতিক অবস্থানকেই নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত করে।

গত ১৭ জুনের ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি বা এমওইউ (MoU)-এর আওতায় উভয় পক্ষের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা গত ৭ জুলাই থেকে দ্বিপক্ষীয় সামরিক সংঘাতের জেরে হু হু করে ভেঙে পড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গত ৮ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, যেহেতু নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে, তাই তিনি মনে করেন ওই যুদ্ধবিরতি চুক্তির নির্ধারিত মেয়াদ সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে গিয়েছে। এর ঠিক ধারাবাহিকতায় গত ১০ জুলাই ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে গোটা পৃথিবীকে জানিয়ে দেন যে, ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সর্বাত্মক যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরায় শুরু হয়ে গিয়েছে।

গত রবিবার পেন্টাগনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ জুলাই থেকে এপর্যন্ত আহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০৭ জনে, যা তাদের আগের প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় ১৪২ জন বেশি। এর ফলে সামগ্রিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী মার্কিন সেনার মোট আহতের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে ৬২৪ জনে পৌঁছেছে। বর্তমানে পেন্টাগনের সরকারি হিসেবে নিহত সেনার সংখ্যা ১৮ জন। এর মধ্যে চারজন বীর সেনাসদস্য গত জুলাই মাসের শুরুর দিকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হওয়ার পরের তীব্র ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে বীরের মতো প্রাণ হারিয়েছিলেন।

চলতি মাসে নিহত চার সেনার নাম অনলাইন সিস্টেমের মূল ‘ইরান যুদ্ধে নিহতদের তালিকা’ থেকে হঠাৎ সরিয়ে নেওয়ার পর ওয়াশিংটনে তীব্র রাজনৈতিক শোরগোল শুরু হয়। এর জেরে গত সপ্তাহে পেন্টাগনের উচ্চপদস্থ মুখপাত্ররা সোশ্যাল মিডিয়ায় মুখ খুলতে বাধ্য হন। তাঁরা সাফ জানান যে, এই পদক্ষেপটি সংঘাতের ফলে ঘটে চলা ক্রমবর্ধমান প্রাণহানির বাস্তব চিত্রটি ধামাচাপা দেওয়ার বিন্দুমাত্র কোনো গোপন অপচেষ্টা ছিল না। বরং এটি কিছু অভ্যন্তরীণ ‘অসংগতি’ ও ‘সাময়িক তথ্য বিভ্রাটের’ অনভিপ্রেত ফল ছিল, যার আইনি ও প্রশাসনিক সমাধান ইতিমধ্যেই করা হয়েছে।

গত রবিবার যুদ্ধবিভাগের পক্ষ থেকে নতুন গঠিত ‘বিদেশি অভিযান’ (Overseas Operations)-এর ক্যাটাগরিতে ওই সমস্ত মৃত সেনাদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত ১৭ জুলাই জর্ডানের একটি গোপন কৌশলগত মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের মারাত্মক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নিখুঁত আঘাতে তিন মার্কিন সেনা নিহত হন। এর ঠিক একদিন পরেই ইরাকের আকাশসীমায় ইরানের একটি ড্রোন নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ধ্বংস করার সময় আরও এক মার্কিন সেনা মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান।

এর আগে গত মে মাসে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রেস ব্রিফিংয়ে মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপস্থিত সাংবাদিকদের জোরালোভাবে জানিয়েছিলেন যে, তৎকালীন ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে। তিনি সে সময় দাবি করেছিলেন যে আমেরিকা সেই অভিযানের সমস্ত নির্ধারিত কৌশলগত লক্ষ্য সফলভাবে অর্জন করেছে। তবে এর বিপরীতে গত সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেসের সামনে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়ে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরান-সংক্রান্ত বর্তমান সংঘাতটি পুরোপুরি সমাপ্ত হয়েছে বলে কোনো সাফাই দেননি। বরং তিনি আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলমান এই দীর্ঘমেয়ায়ী সংঘাতের সম্ভাব্য বিপুল আর্থিক ব্যয়ের হিসেব আইনপ্রণেতাদের সামনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।