বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করলেন ছেলে! ৩৩ বছর বয়সে জাতীয় দলে ডাক পেলেন মধ্যপ্রদেশের সারাংশ

দীর্ঘ দিনের সাধনা, ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক সাফল্য এবং অবিচল ধৈর্যের অবশেষে কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি মিলল। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে আসন্ন দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের জন্য ভারতের জাতীয় দলে প্রথম বার সুযোগ পেলেন মধ্যপ্রদেশের অভিজ্ঞ অফস্পিনার ও অলরাউন্ডার সারাংশ জৈন। আসন্ন এই শ্রীলঙ্কা সফরের জন্য আজ, মঙ্গলবার দল ঘোষণা করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI)। ৩৩ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারের অন্তর্ভুক্তি ঘরোয়া ক্রিকেটে বছরের পর বছর ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়া বহু খেলোয়াড়ের কাছেই এক নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে। চলতি সিরিজে ইনজুরি বা চোটের কারণে তারকা অলরাউন্ডার ওয়াশিংটন সুন্দরকে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর পরিবর্তে ঠিক একই ধরনের দক্ষতা ও বিকল্প সম্পন্ন ক্রিকেটার খুঁজতেই শেষ পর্যন্ত সারাংশের উপর ভরসা রেখেছে অজিত আগরকরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নির্বাচক কমিটি। মূলত ব্যাট ও বল—উভয় বিভাগেই সমানভাবে অবদান রাখার অসাধারণ ক্ষমতাই তাঁকে অন্যদের থেকে এগিয়ে রেখেছে।
ইন্দোরের ছেলে সারাংশের ক্রিকেট-যাত্রা শুরু হয়েছিল ঘরোয়া ক্রিকেটের সুদীর্ঘ মঞ্চে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মধ্যপ্রদেশের হয়ে তাঁর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ঘটেছিল। এরপর ধাপে ধাপে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি নিজেকে একজন নির্ভরযোগ্য অলরাউন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মধ্যপ্রদেশ, ‘সেন্ট্রাল জোন’ এবং ‘রেস্ট অব ইন্ডিয়া’-র হয়ে লাল বলের ক্রিকেটে তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে। এখনও পর্যন্ত খেলা ৫৪টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে তিনি ১৮৮টি উইকেট শিকার করার পাশাপাশি ঝুলিতে পুরেছেন ২,২২৩ রান। যেখানে তাঁর ব্যাটিং গড় ৩১.৭৫ এবং নামের পাশে রয়েছে দুটি শতরান ও ১৪টি অর্ধশতরান। এই পরিসংখ্যানগুলোই স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে তিনি কেবল একজন সাধারণ স্পিনার নন, বরং প্রয়োজনে দলের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একজন ব্যাটারও বটে। ক্রিকেটের সঙ্গে সারাংশের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও পারিবারিক; তাঁর বাবা সুবোধ জৈনও একসময় মধ্যপ্রদেশের হয়ে রঞ্জি ট্রফি খেলেছিলেন, তবে দেশের হয়ে জাতীয় দলে খেলার যে স্বপ্ন তাঁর ছিল, তা অধরাই থেকে গিয়েছিল। বাবার সেই অপূর্ণ স্বপ্নই যেন অবশেষে বাস্তবে পূরণ করলেন ছেলে। বিশিষ্ট কোচ চন্দ্রকান্ত পণ্ডিতের কঠোর তত্ত্বাবধানে সারাংশের ক্রিকেট কেরিয়ারে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসে এবং তিনি ধীরে ধীরে দলের অন্যতম ভরসাযোগ্য অলরাউন্ডারে পরিণত হন। বিশেষ করে, ২০২২ সালে মধ্যপ্রদেশের ঐতিহাসিক রঞ্জি ট্রফি জয়ে তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ। সেই ফাইনালে মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে চাপের মুখে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলার পাশাপাশি বল হাতেও তিনি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন।
জাতীয় দলের দরজা তাঁর জন্য খুলে যাওয়ার পিছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ‘ইন্ডিয়া এ’-এর হয়ে তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স। শ্রীলঙ্কা ‘এ’-র বিরুদ্ধে দ্বিতীয় আনঅফিশিয়াল টেস্টে দুর্দান্ত অপরাজিত ৭০ রান করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি উইকেট তুলে নিয়ে তিনি নির্বাচকদের নজর কেড়ে নিয়েছিলেন। উপমহাদেশের স্পিন-সহায়ক উইকেটে ব্যাট এবং বল—উভয় বিভাগেই যে তিনি সমানভাবে কার্যকর হতে পারেন, তা এই সিরিজেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। তবে একটি বিষয় বেশ লক্ষণীয় যে, লাল বলের ক্রিকেটে এত সব ধারাবাহিক সাফল্য সত্ত্বেও আইপিএলের মঞ্চে কিন্তু সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থেকেছেন সারাংশ। ২০২৪, ২০২৫ এবং ২০২৬—টানা তিন মরসুম ধরে আইপিএলের নিলামে নাম তুললেও কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি তাঁকে দলে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। তবে সেই সমস্ত হতাশার অধ্যায় এখন সম্পূর্ণরূপে অতীত। এবার তাঁর সামনে ভারতের ঐতিহাসিক টেস্ট জার্সি গায়ে চাপানোর সোনালী সুযোগ। আগামী ১৫ আগস্ট থেকে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে শুরু হতে যাওয়া প্রথম টেস্ট ম্যাচে তিনি প্রথম একাদশে শেষ পর্যন্ত জায়গা করে নিতে পারেন কি না, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন দেশের সমস্ত ক্রিকেটপ্রেমীরা।