ফের কি রেকর্ড ভাঙবে? মধ্য এশিয়া সংঘাত শিথিল হতেই রকেটের গতিতে ছুটছে সোনা ও রুপো, জানুন আজকের লেটেস্ট রেট

বেশ কিছুদিন ধরে চলা লাগাতার সংশোধন এবং বাজারের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ভারতীয় bullion বাজারে আবারও ফিরে এসেছে অভাবনীয় চাঞ্চল্য। সোমবার মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জে (MCX) সোনা ও রুপোর ফিউচার্সের দামে এক রেকর্ড ভাঙা বড় উত্থান লক্ষ্য করা গেছে, যা গোটা দেশের বিনিয়োগকারী মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং অর্থনৈতিক সূচকের এই আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে মূল্যবান এই ধাতু দুটির চাহিদা এক লাফে বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্ব বাজারে যে অর্থনৈতিক পজিশন তৈরি হয়েছে, তাতে নিরাপদ বিনিয়োগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে আবারও সোনা ও রুপোর ওপর ভরসা রাখতে শুরু করেছেন বড় বড় লগ্নিকারীরা।
সোমবার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসের শুরুতেই এমসিএক্স-এ (MCX) ১০ গ্রাম সোনার ফিউচার্সের দাম এক ধাক্কায় বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১,৪৪,১৩০ টাকা। আগের দিনের বন্ধ হওয়া দামের তুলনায় এই উল্লম্ফন ছিল প্রতি ১০ গ্রামে ১,০২৪ টাকা বা শতকরা হিসেবে প্রায় ০.৭২ শতাংশ বেশি। সোনার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে দৌড় শুরু করেছে রুপোও। একই ট্রেডিং সেশনে রুপোর ফিউচার্সের দাম প্রতি কেজিতে সরাসরি ২,২৪,৬৬৩ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে একদিনের ব্যবধানে রুপোর দাম প্রতি কেজিতে ২,৫২৫ টাকা বা প্রায় ১.১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাম্প্রতিককালের সমস্ত রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেছে। বাজারের এই হঠাৎ রূপ পরিবর্তনে খুচরা ক্রেতা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারী—সবার চোখ এখন কমোডিটি স্ক্রিনের দিকে।
এই তীব্র ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার নেপথ্যে একাধিক অতি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কারণ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহল। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্য এশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা হলেও প্রশমিত হওয়ার ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলেছে। কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে কিছুটা স্বস্তির বাতাস বইতে শুরু করায় বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়েছে। বিশেষ করে ইরান সরকারের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের সামরিক আক্রমণ বা আগ্রাসন পুরোপুরি বন্ধ রাখে, তবে তেহরানও পাল্টা কোনো হামলা চালাবে না। এই কূটনৈতিক বার্তার পরই ওয়াশিংটনও আপাতত মধ্য এশিয়ায় তাদের বড় ধরনের সামরিক অভিযান ও অপারেশন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই পারস্পরিক সমঝোতার ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে মারাত্মক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কমে গেছে। ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক কমোডিটি বাজারে অপরিশোধিত বা ক্রুড অয়েলের দাম হু হু করে নিচে নেমে এসেছে এবং তা প্রায় ৪ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। তেলের দাম এইভাবে আচমকা কমে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বা ইনফ্লেশনের আশঙ্কাও এক ধাক্কায় অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির পারদ নামার পাশাপাশি মার্কিন ডলার সূচক বা ডলার ইনডেক্স ১০১-এর মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচে নেমে আসায় আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে ইউএস ডলারের তেজ কিছুটা হলেও ফিকে হয়েছে। এর ফলে ডলারে লেনদেন হওয়া সোনা ও রুপো আন্তর্জাতিক এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে আগের তুলনায় অনেকটাই সস্তা ও লাভজনক হয়ে উঠেছে। এই সার্বিক পরিস্থিতির প্রত্যক্ষ প্রভাবেই আন্তর্জাতিক বুলিয়ন মার্কেটে মূল্যবান ধাতুর চাহিদা আকাশচুম্বী হয়েছে এবং তার সুদূরপ্রসারী ও তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে আমাদের দেশীয় গার্হস্থ্য বাজারেও।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকটায় সোনা ও রুপো উভয় মূল্যবান ধাতুই তাদের সর্বকালীন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর এক ঐতিহাসিক নজির গড়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মধ্য এশিয়ার সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে যায়। তেলের দাম চড়ার কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির জিগির জোরালো হয় এবং অর্থনৈতিক মহলে প্রবল ধারণা তৈরি হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক অর্থাৎ ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার দীর্ঘ সময়ের জন্য উঁচুতে ধরে রাখতে বাধ্য হবে। ফেডের এই সম্ভাব্য কঠোর মনোভাবের জেরে মার্কিন ডলার আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ফলস্বরূপ কোনো সুদের ডিভিডেন্ড না থাকা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ কিছুটা হলেও মন্থর হয়ে পড়েছিল। সেই কারণেই গত বেশ কিছুদিন ধরে সোনা ও রুপোর বাজার বেশ বড় ধরনের সংশোধনের মুখে পড়েছিল এবং দাম কিছুটা হলেও নিম্নমুখী হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে গোটা দেশের বাজারের তীক্ষ্ণ নজর এখন মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের আসন্ন উচ্চপর্যায়ের নীতিগত বৈঠকের দিকে। যদিও অধিকাংশ আর্থিক বিশ্লেষকদের ধারণা যে, এই দফায় ফেড সুদের হার অপরিবর্তিতই রাখতে পারে, তবুও ভবিষ্যতের কোনো বৈঠকে সুদের হার হ্রাসের সামান্যতম ইঙ্গিত মিললেই সোনা ও রুপোর দাম আরও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে এবং বাজারে নতুন বুল রান শুরু হতে পারে। তবে এর উল্টোটাও সত্যি; মার্কিন ফেড যদি তাদের পূর্বের মতো অত্যন্ত কঠোর আর্থিক অবস্থান বা হকিশ স্ট্যান্ড বজায় রাখে, তবে মূল্যবান ধাতুর এই চলমান উত্থানে কিছুটা হলেও ব্রেক বা লাগাম পড়তে পারে। অভিজ্ঞ বাজার বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ হলো, দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য সোনা সর্বদাই একটি পরীক্ষিত ও নিরাপদ সম্পদ হিসেবে কাজ করবে, কিন্তু বর্তমানের এই অতি অস্থির ও পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের বড় ও নতুন বিনিয়োগের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিটি চালচিত্র এবং মার্কিন ফেডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর গভীর নজর রাখাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।