ব্যাঙ্ক অফ বরোদার ১ টেরাবাইট ডেটা হ্যাক! ডার্ক ওয়েবে আধার ও ব্যাঙ্কিং তথ্য ফাঁসের ঘটনায় তোলপাড়

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ব্যাঙ্ক অফ বরোদার (Bank of Baroda) সুরক্ষিত তথ্যভাণ্ডারে এক বিশাল সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এক হ্যাকার প্রকাশ্যে দাবি করেছে যে সে অত্যন্ত সফলভাবে ব্যাঙ্কের মূল সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করে প্রায় ১ টেরাবাইট সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, চুরি যাওয়া এই বিপুল পরিমাণ তথ্য ইতিমধ্যেই ডার্ক ওয়েবে বিনামূল্যে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত বা প্রকাশিত করে দেওয়া হয়েছে। ফাঁস হওয়া এই ভয়াবহ তথ্যের ভাণ্ডারে সাধারণ গ্রাহকদের ব্যক্তিগত ও কর্পোরেট ব্যাঙ্কিং সংক্রান্ত গোপন নথি, পরিচয়পত্রিক তথ্য, গ্রাহকদের নাম, বিশদ ঋণের ইতিহাস এবং একাধিক অতি সংবেদনশীল বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে।
হ্যাকারদের এই গুরুতর দাবির সত্যতা নিয়ে দেশজুড়ে যখন তীব্র প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তখন নিজেদের দাবির সপক্ষে প্রামাণ্য নমুনা হিসেবে বেশ কিছু গোপন নথির স্ক্রিনশট ও লিঙ্ক প্রকাশ্যে এনেছে সেই হ্যাকার গোষ্ঠী। ‘ক্যাশলেসকনজিউমার’-এর প্রতিষ্ঠাতা তথা বিশিষ্ট সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার শ্রীকান্ত লক্ষ্মণন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ (যেটি পূর্বে টুইটার নামে পরিচিত ছিল) সেই নমুনা নথির স্ক্রিনশটগুলি শেয়ার করে গোটা বিষয়টি সকলের গোচরে এনেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে যখন তিনি ওই লিঙ্কগুলি পরীক্ষা করেন, তখন সেগুলি সম্পূর্ণ সক্রিয় অবস্থায় ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে এই সংবেদনশীল নথিগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার পর এটিকে ভারতীয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার জন্য একটি একচ্ছত্র ও ভয়াবহ ‘সাইবার বিপর্যয়’ বলেই চিহ্নিত করেছেন তিনি।
শ্রীকান্ত লক্ষ্মণনের জোরালো দাবি অনুযায়ী, ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হওয়া এই তথ্যের মধ্যে কেবল সাধারণ গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্যই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর মধ্যে ব্যাঙ্কের অত্যন্ত গোপনীয় অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক নথিও রয়েছে, যা ফাঁস হওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে আর্থিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। প্রকাশিত নথিগুলির একটি দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ব্রাঞ্চ অডিট রিপোর্ট, ঋণ মূল্যায়নের গোপন নথি, ব্যাঙ্কের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন পেপারস, ভিজিল্যান্স তদন্ত সংক্রান্ত সংবেদনশীল কাগজপত্র, জনপ্রিয় মোবাইল অ্যাপ bobWorld-এর এক্সক্লুসিভ অডিট রিপোর্ট, বিভিন্ন শাখার শত শত গ্রাহকদের ব্যক্তিগত আবেদনপত্র এবং অন্যান্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাঙ্কিং ফাইল।
সাইবার সুরক্ষা ও ডার্ক ওয়েব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণকারী স্বনামধন্য ওয়েবসাইট ‘ransomware.live’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার প্রথম এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এই ধ্বংসাত্মক সাইবার হামলার নেপথ্যে ‘TripleX’ নামক তুলনামূলকভাবে নতুন একটি কুখ্যাত হ্যাকার গোষ্ঠী সক্রিয় থাকতে পারে। এর আগে চলতি বছরের মে মাসে ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এবং শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ‘PT Bank Negara Indonesia’-র সিস্টেমে হানা দিয়ে প্রায় ২ টেরাবাইট গোপন তথ্য চুরি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল এই হ্যাকার দলটির বিরুদ্ধে। সেই আগের হামলায় গ্রাহকদের আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত রেকর্ড, পরিচয়পত্র, বাণিজ্যিক চুক্তিপত্র এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ নথি নির্বিচারে ফাঁস করে দেওয়া হয়েছিল।
ব্যাঙ্ক অফ বরোদার মতো একটি প্রথমসারির রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে এই ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটার পর ভারতের সামগ্রিক ব্যাঙ্কিং সেক্টরের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিকাঠামো নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) নির্ভর অত্যাধুনিক সাইবার হামলার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় দেশের সমস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও বহুমাত্রিক, দুর্ভেদ্য ও শক্তিশালী ডিজিটাল সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কড়া পরামর্শ দিচ্ছেন সাইবার বিশেষজ্ঞরা।
তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এত বড় মাপের একটি সাইবার হামলার অভিযোগ সামনে আসার পরও এখনও পর্যন্ত ব্যাঙ্ক অফ বরোদার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সরকারি বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। একইভাবে দেশের শীর্ষস্থানীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ‘CERT-In’ কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া’ (RBI)-র পক্ষ থেকেও এই তথ্য ফাঁসের ঘটনার সত্যতা এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়নি। উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্বনামধন্য সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ‘UpGuard’ একটি বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করে জানিয়েছিল যে, একটি তৃতীয় পক্ষের ক্লাউড ডেটাবেসে ২ লক্ষ ৭৩ হাজারেরও বেশি ভারতীয় ব্যাঙ্কিং রেকর্ড অসুরক্ষিত ও উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। যার মধ্যে প্রায় ৬ হাজার রেকর্ড সরাসরি ব্যাঙ্ক অফ বরোদার গ্রাহকদের সঙ্গেই সম্পর্কিত ছিল। যদিও সেই নির্দিষ্ট ঘটনাটি সরাসরি ব্যাঙ্কের নিজস্ব নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে অনুপ্রবেশের কারণে ঘটেছিল না।