জন্মদিনের আগেই জরায়ুতে বাসা বেঁধেছে ৯টি টিউমার! অস্ত্রোপচারের টেবিলে লড়াকু লড়াই ‘মিঠাই’ খ্যাত অভিনেত্রীর

জনপ্রিয় বাংলা টেলিভিশন সিরিয়াল ‘মিঠাই’ খ্যাত প্রতিভাবান অভিনেত্রী তন্বী লাহা রায়ের জন্য জীবনের এই বছরের জন্মদিনের মাসটি এক দুঃস্বপ্নের মতো কেটেছে। সাধারণত জন্মদিনের এই বিশেষ মাসটিতে আনন্দ উদযাপন কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও, নিয়তির ফেরে তা সম্পূর্ণ বিষাদে পরিণত হয়েছে। ঘুরতে যাওয়ার সমস্ত টিকিট বাতিল তো করতেই হয়েছে, উল্টে দিনের পর দিন চরম উদ্বেগ, রাতের পর রাত ঘুমহীনতা, একের পর এক ব্লাড টেস্ট, এমআরআই স্ক্যান এবং ইনজেকশনের যন্ত্রণার মাঝেই কাটছে তাঁর দিনগুলো। জীবনের এই চরম কঠিন ও মর্মান্তিক সত্যটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভক্তদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে অভিনেত্রী লিখেছেন যে, এমন ভয়াবহ জন্মমাস তাঁর জীবনে তিনি কখনও কল্পনাও করেননি।

একাধিক শারীরিক জটিলতার পর যখন চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হন, তখন নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখে তাঁর পায়ের তলার মাটি সরে যায়। চিকিৎসকরা জানান, তাঁর জরায়ুতে বাসা বেঁধেছে মোট ৯টি ফাইব্রয়েড টিউমার! এর মধ্যে সবথেকে ভয়াবহ বিষয় হলো, দুটি টিউমারের আকার ছিল প্রায় সাড়ে নয় সেন্টিমিটার, যা চিকিৎসকদের পরিভাষায় প্রায় “দুটি ছয় মাসের বেবি-সাইজ়”-এর সমান। বাকি টিউমারগুলিও মাঝারি আকারের ছিল। টিউমারগুলির এমন অস্বাভাবিক আকার এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান দেখে সমস্ত চিকিৎসক একটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানান—তাঁদের মতে, এই জটিল রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অস্ত্রোপচার ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো রাস্তা খোলা নেই।

জীবনে প্রথমবার এত বড় এবং ঝুঁকিপূর্ণ একটি অপারেশনের মুখোমুখি হওয়ার খবরে স্বাভাবিকভাবেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং ভয় পেয়ে যান তন্বী। প্রায় এক মাস ধরে তিনি শহরের একাধিক বিশিষ্ট চিকিৎসকের দরজায় চক্কর কেটেছেন, গাদা গাদা মেডিকেল রিপোর্ট আর এমআরআই করিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মনের ভেতর খালি একটাই খটকা বারবার তাড়া করে বেড়াচ্ছিল—কার হাতে তিনি নিজের জীবনের প্রথম অপারেশনটি সঁপে দেবেন এবং কাকে সম্পূর্ণ ভরসা করবেন? অবশেষে তাঁর এই মানসিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন ড. নীলভ ভাদুড়ী। তন্বী কৃতজ্ঞতার সঙ্গে জানান যে, সেই চিকিৎসক অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে তাঁর সমস্ত জটিল ফাইলপত্র দেখেন, প্রতিটি বিষয় বিস্তারিত বুঝিয়ে বলেন এবং মাঝেমধ্যে হালকা ইয়ার্কি-ঠাট্টা করে তাঁর মনের ভিতরের অজানা ভয়টাও অনেকটা হালকা করে দেন।

ডাক্তারবাবুর ওপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রেখেই তিনি অবশেষে সাহসিকতার সঙ্গে অপারেশনের টেবিলে যান। টানা সাড়ে চার ঘণ্টার এক দীর্ঘ ও অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচারের পর অত্যন্ত নিখুঁত ও যত্নের সঙ্গে তাঁর শরীর থেকে মোট ৯টি ফাইব্রয়েড টিউমার সফলভাবে বের করে আনা হয়। এই সফল অপারেশনের পর চিকিৎসক ও তাঁর টিমের প্রতি অন্তরের অন্তস্তল থেকে চরম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী। শুধু তাই নয়, এই কঠিন বিপদের দিনেও একটি নতুন ওয়েব সিরিজে লিড রোলে অভিনয়ের কথা চললেও শুটিং শুরু হওয়ার আগেই এই মারাত্মক রোগের কবলে পড়ায় তিনি প্রবল আশঙ্কায় ভুগেছিলেন যে তাঁকে বোধহয় এই প্রোজেক্ট থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু পরিচালক অরিন্দম শীল ও সংশ্লিষ্ট প্রযোজনা সংস্থা তাঁকে বাতিল করা তো দূরের কথা, অত্যন্ত শক্ত হাতে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। ডাক্তার আর পরীক্ষার চক্করের মাঝেই যতটুকু সম্ভব শুটিং সেরেছিলেন তিনি। পুরো কাজ শেষ হওয়ার আগেই অস্ত্রোপচার করাতে হলেও বাকি একদিনের শুটিংয়ের জন্য তাঁকে যথেষ্ট সময় দিয়েছেন প্রযোজক ও পরিচালক। সহকর্মীদের এমন অকৃত্রিম ভরসা ও ভালোবাসা তিনি জীবনে কোনোদিন ভুলবেন না বলেই জানিয়েছেন।

এই দীর্ঘ লড়াইয়ের দিনে নিজের পরিবার ও মা-বাবার অকুন্ঠ সমর্থনের কথাও সকৃতজ্ঞে স্মরণ করেছেন তন্বী। তাঁর স্পষ্ট কথা, পরিবারের ভালোবাসা আর ঈশ্বরের আশীর্বাদ না থাকলে হয়তো এই কঠিন জার্নিটা এত সাহস নিয়ে একা পার করতে পারতেন না। আপাতত সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়ার (recovery phase) মধ্যে রয়েছেন তিনি। আগামী ২৭ জুলাই তাঁর জন্মদিনের ঠিক মুখেই এই ভয়াবহ শারীরিক ধকল সামলে উঠে এখন তাঁর একটাই লক্ষ্য—খুব দ্রুত নিজের চেনা ফ্লোরে ফিরে যাওয়া। তন্বীর সোজা ও সরল স্বীকারোক্তি, শুটিংয়ের লাইট-ক্যামেরা আর কর্মব্যস্ত ফ্লোরই হলো তাঁর আসল ভালো থাকার ওষুধ। ভক্তিতে চোখ বুজে তাই তাঁর একটাই প্রার্থনা—’জয় মা তারা, হর হর মহাদেব।’