মার্কিন মুলুকে মোক্ষম ধাক্কা! ভারতের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১০% অতিরিক্ত শুল্কের খাঁড়া

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও একবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরাসরি ‘ট্যারিফ বোম’ বা শুল্কের খাঁড়া নামিয়ে আনলেন। আর এবারের এই কঠোর সিদ্ধান্তের সরাসরি কোপে পড়তে চলেছে ভারত সহ বিশ্বের মোট ১৭টি দেশ। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ভারত থেকে আমেরিকায় আমদানিকৃত নির্দিষ্ট কিছু বাছাই করা পণ্যের ওপর এবার থেকে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক বা ট্যারিফ কার্যকর করা হবে। অর্থাৎ, যে সমস্ত পণ্যের ওপর পূর্বে থেকেই নির্দিষ্ট আমদানি শুল্কের নিয়ম চালু ছিল, বর্তমানের এই নতুন নিয়মের ফলে তার সঙ্গে আরও অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্কের বোঝা যুক্ত হবে।

এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে যে, বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলিতে অনেক সময় বলপূর্বক বা জোরপূর্বক শ্রমের (Force Labour) মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা হয়ে থাকে। আমেরিকার কড়া নীতি হল তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে যেন এজাতীয় কোনো শুল্ক বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তৈরি পণ্য প্রবেশ করতে না পারে। এই উদ্দেশ্যেই মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি কার্যালয় বা USTR অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে একটি বিশদ তদন্ত পরিচালনা করে। সেই তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, বিশ্বের একাধিক দেশ জবরদস্তি মূলক উপায়ে উৎপাদিত পণ্যের অবাধ প্রবেশ রোধ করার জন্য যথেষ্ট বা পর্যাপ্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কঠোর সেকশন ৩০১ (Section 301) আইনের ধারা অনুযায়ী ভারতসহ মোট ১৭টি দেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

বাস্তব ক্ষেত্রে এই নতুন শুল্ক নীতির প্রকৃত অর্থ কী দাঁড়াবে? সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ধরুন ভারত থেকে কোনো উৎপাদিত পণ্য আমেরিকার বাজারে রপ্তানি করা হলো, যার ওপর আগে থেকেই ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক বা ট্যারিফ ধার্য করা ছিল। কিন্তু বর্তমানের এই নতুন নিয়মের কারণে সেই একই পণ্যের ওপর আরও অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক যোগ হয়ে যাবে। এর ফলস্বরূপ মার্কিন মুক্ত বাজারে ভারতীয় ওই পণ্যটির চূড়ান্ত খুচরা মূল্য আগের তুলনায় অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে। স্বাভাবিক নিয়মেই পণ্যের দাম বেড়ে গেলে বাজারে তার চাহিদা বা ক্রেতাদের আকর্ষণ কমবে এবং এর ফলে ভারতের দূরদর্শী রপ্তানিকারকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।

তবে এর মাঝেও কিছুটা স্বস্তির বিষয় এই যে, প্রারম্ভিক পর্যায়ে ওয়াশিংটনের অন্দরে গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল ভারত সরকারের ওপর ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হতে পারে। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে ভারত এবং আমেরিকার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের মধ্যে আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড নিয়ে আলোচনার পর মার্কিন প্রশাসন শুল্কের হার কমিয়ে ১০ শতাংশের স্ল্যাবে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, আমেরিকা একা ভারতকে এই নিয়মের আওতায় আনেনি, বরং এই তালিকায় রয়েছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা, মেক্সিকো, শ্রীলঙ্কা ও যুক্তরাজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলিও।

ভারত বা অন্যান্য দেশের সমস্ত পণ্যের ওপর কি এই অতিরিক্ত শুল্কের সরাসরি প্রভাব পড়বে? এই প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, সমস্ত পণ্যের ওপর এই কোপ পড়বে না। উদাহরণস্বরূপ, ইস্পাত (Steel) এবং অ্যালুমিনিয়ামের মতো ভারী ধাতু ও পণ্য, যেগুলির ওপর পূর্বে থেকেই আলাদা বিশেষ ট্যারিফ বা শুল্কের নিয়ম বলবৎ রয়েছে, সেগুলি এই নতুন নিয়মের আওতার সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়েছে। এছাড়া কিছু বিশেষ জ্বালানি বা শক্তি সংক্রান্ত উপাদান, সার (Fertilizer) এবং নির্দিষ্ট বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সম্পাদিত বাণিজ্যিক লেনদেনগুলিও এই অতিরিক্ত শুল্কের আওতামুক্ত থাকবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই এই ধরনের মার্কিন পদক্ষেপের বিষয়ে কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিল। সেই কারণেই সরকারের পক্ষ থেকে জোরপূর্বক শ্রম সংক্রান্ত পণ্যের নিখুঁত চিহ্নিতকরণ এবং তাদের ওপর কঠোর নজরদারি চালানোর জন্য সুনির্দিষ্ট নতুন নির্দেশিকা তৈরির কাজ শুরু করা হয়েছিল, যাতে আন্তর্জাতিক শ্রমের মান বজায় রেখে ভবিষ্যতে এজাতীয় বাণিজ্য বাধাবিপত্তি এড়ানো সম্ভব হয়।