সচিনের ব্যাটে কি তবে ক্লিন বোল্ড মোদি সরকার? নিট কাণ্ডে মুখ খুলতেই দেশজুড়ে তোলপাড়!

দেশের ক্রীড়াজগতে এবং শিক্ষা মহলে বর্তমানে সবচেয়ে চর্চিত বিষয় হলো নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তার জেরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র ছাত্র আন্দোলন। এর আগে অলিম্পিক্সে সোনাজয়ী কিংবদন্তি অভিনব বিন্দ্রা ছাত্র-আন্দোলনের সমর্থনে জোরালো সওয়াল করেছিলেন। আর এবার সেই প্রতিবাদের পালে হাওয়া লাগিয়ে ঠিক বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর যন্তর-মন্তরে চলমান ছাত্র ও যুব সমাজের আন্দোলনকে সম্পূর্ণ নৈতিক ও যুক্তিযুক্ত বলে দাবি করলেন খোদ ‘ক্রিকেট ঈশ্বর’ সচিন রমেশ তেন্ডুলকর। পরোক্ষভাবে এই ছাত্র আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে তিনি দেশজুড়ে মেধার জয় এবং কঠোর সততার পক্ষে সওয়াল করেছেন, যা নিয়ে বর্তমানে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই নিট প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতি কাণ্ডের জেরে দেশের লক্ষ লক্ষ হবু চিকিৎসকের ভবিষ্যৎ আজ চরম অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঢেকে গেছে। এই আবহে গত কয়েকদিনে রাজধানীর যন্তর-মন্তরে দেশের ছাত্র ও যুব সমাজের আন্দোলন বহুগুণ বেশি গতি পেয়েছে। বিশেষ করে প্রখ্যাত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক-এর অনশন কর্মসূচি এই ছাত্র বিক্ষোভকে আরও বেশি তরান্বিত করেছে। গত ২০ জুলাই আন্দোলনরত ক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের পূর্বঘোষিত ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আস্ত যন্তর মন্তর চত্বর এক রক্তক্ষয়ী ও রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছিল। বিক্ষোভরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর পুলিশের কঠোর লাঠিচার্জ ও নির্বিচারে ধরপাকড়ের ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

এতকিছুর পরেও পরীক্ষাব্যবস্থায় আমূল কাঠামোগত সংস্কার এবং সর্বোপরি নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই তীব্র লজ্জাজনক ঘটনার দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে ইস্তফার দাবিতে নিজেদের অবস্থানে সম্পূর্ণ অনড় রয়েছে আন্দোলনকারী ছাত্রসমাজ। ঠিক এইরকম এক উত্তপ্ত ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে অবশেষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে কলম ধরেছেন মাস্টার ব্লাস্টার সচিন তেন্ডুলকর। নিজের অফিসিয়াল এক্স (X) হ্যান্ডেলে বৃহস্পতিবার একটি সুদীর্ঘ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা পোস্ট করে তিনি লেখেন, “আমার বাবা একজন অধ্যাপক ছিলেন এবং তিনি বহু যুব ছাত্র-ছাত্রীর মেন্টর বা পথপ্রদর্শক ছিলেন। তিনি ছাত্রদের মনে সব সময় একটি কথাই গভীরভাবে গেঁথে দিয়েতেন যে, জীবনে ব্যর্থতা আসতেই পারে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ছলচাতুরি বা শর্টকাট পদ্ধতি কাম্য নয়। জীবনে কখনও কোনো সহজ বা অনৈতিক উপায় বেছে নেবে না।”

সচিন আরও সংযোজন করে লেখেন, “আমাদের বর্তমান সমাজ কঠোর পরিশ্রমের প্রকৃত মূল্য না-দিয়ে কেবল চূড়ান্ত ফলাফল দেখে। মেধাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করে মানুষ সবসময় সহজ ও অসৎ উপায় খুঁজে বের করতে চায়। তাই সমাজের একজন দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলের একটা সম্মিলিত ও বড় দায়িত্ব রয়েছে সঠিক নীতি ও সংস্কৃতি গড়ে তোলার। এটা খুব সহজেই বোধগম্য যে আজ দেশের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা মনে করছে তাঁদের বছরের পর বছর ধরে করা কঠোর পরিশ্রমের কোনো সঠিক মূল্য মিলছে না। কিন্তু আমাদের সকলকে একসঙ্গে মিলে এটা নিশ্চিত করতে হবে যাতে পরবর্তীতে আর কোনো শিক্ষার্থীকে এমন হতাশাজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়।”

তরুণ প্রজন্মের প্রশংসায় সচিন লেখেন, “দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রচুর স্বপ্ন এবং অফুরন্ত শক্তি রয়েছে। অভিভাবক, শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন এমনকী প্রশাসন ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে আমাদের সকলের মূল ভূমিকা হওয়া উচিত দেশের যুব সমাজকে সবসময় উৎসাহিত করা। আমাদের এমন একটা সুস্থ পরিমণ্ডল তৈরি করতে হবে যেখানে কঠোর পরিশ্রমের প্রকৃত মূল্য মিলবে, সততা সবসময় উৎসাহিত হবে এবং শেষ পর্যন্ত একমাত্র মেধারই জয় হবে। আমি সম্পূর্ণ আস্থাশীল যে আমাদের ছেলেমেয়েদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ শক্তিশালী করতে এবং তাঁদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন রক্ষা করার জন্য আমরা খুব শীঘ্রই সঠিক সমাধান খুঁজে পাব।”

এদিকে, দেশজুড়ে চলা এই তীব্র নিট প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি এবং রাজধানী সহ গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়া ছাত্র আন্দোলনের চরম চাপের মুখে অবশেষে বৃহস্পতিবার নিজের দীর্ঘ মৌনতা ভেঙেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পেপার লিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত সমস্ত অভিযুক্তদের কঠোরতম শাস্তির জোরালো আশ্বাস দিয়ে তিনি একটি বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের বড় কথা ঘোষণা করেছেন। ওই দিন গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে এক ভিডিওবার্তায় তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, “প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর গত আড়াই মাসে একাধিক কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বহু প্রধান দোষীদের ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তারা বর্তমানে খাকির জালে বন্দি রয়েছে। আমাদের সরকারের এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল এটা নিশ্চিত করা যাতে কোনোভাবেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মূল্যবান শিক্ষাবর্ষ নষ্ট না-হয়।”

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আরও বলেন, “আমি আজই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক ও বিভাগগুলোকে অতি দ্রুত একটি বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের কঠোর নির্দেশ দিয়েছি। গভীর রাতেই সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো আমার কাছে এই সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রস্তাবনা পেশ করেছে। এই ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির বিধানের প্রস্তাবটি আগামিকাল, শুক্রবার সকালেই মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচিত হবে। মন্ত্রিসভার সমস্ত সদস্যদের মহামূল্যবান পরামর্শের ভিত্তিতে এটি পুরোপুরি চূড়ান্ত করা হবে। যেহেতু আগামী সোমবার থেকেই সংসদের চলতি বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় সপ্তাহ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে চলেছে, তাই যত দ্রুত সম্ভব আগামী সপ্তাহের মধ্যেই সংসদে এই সংক্রান্ত বিলটি আইন হিসেবে পাস করানোর সবরকম চেষ্টা করা হবে।”