নিট দুর্নীতির প্রতিবাদে পুলিশের ভ্যান আটকে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন মডেল! রাতারাতি লাইমলাইটে বাংলার কোন সাহসী কন্যা?

মুম্বইয়ের বিনোদন ও ফ্যাশন জগতের চাকচিক্য ছেড়ে হঠাৎই খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মডেল, অভিনেত্রী, সঞ্চালক এবং উদ্যোক্তা রিয়া আহির। পেশাগতভাবে ‘রিয়াসাত’ নামক একটি জনপ্রিয় পোশাক ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকা রিয়া এর আগে মূলত ফ্যাশন ও বিনোদন শিল্পের কাজের জন্যই বেশি পরিচিত ছিলেন। তবে সম্প্রতি নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুম্বইয়ের রাজপথে চলা একটি তীব্র ছাত্র আন্দোলনের জেরে সম্পূর্ণ বদলে গেছে তাঁর পরিচিতি। পুলিশি দমনপীড়ন ও আন্দোলনরত পড়ুয়াদের নির্বিচারে ভ্যানে তুলে আটকের ঘটনা সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি যেভাবে পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন, তা আজ গোটা দেশজুড়ে এক সাহসিকতার নজির গড়ে তুলেছে।

ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ মুম্বইয়ের ঐতিহাসিক শিবাজী পার্কের কাছাকাছি এলাকা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় রিয়ার চোখে পড়ে যে, পুলিশ প্রশাসন বেশ কিছু আন্দোলনকারী পড়ুয়াকে জোরপূর্বক ভ্যানে তুলে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ অন্যায় ও অকারণে সাধারণ ছাত্রদের এইভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে তিনি এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেননি। নিজের পেশাগত পরিচিতি বা পরিণতির কথা না ভেবে তিনি সোজা দৌড়ে গিয়ে সরাসরি পুলিশের প্রিজন ভ্যানের ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং অবিলম্বে সমস্ত আটক পড়ুয়াদের নিঃশর্তে মুক্তি দেওয়ার জোরালো দাবি জানান। এরপর ঘটনাস্থলেই কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘক্ষণ চরম বাদানুবাদ ও তর্কবিতর্ক শুরু হয়।

পুলিশের পক্ষ থেকে সেই সময় তাঁকে বারবার আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হয় যে, ভ্যানটি নির্দিষ্ট দূরত্বে সামান্য এগিয়ে গেলে আটক পড়ুয়াদের ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু রিয়া অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা প্রশ্ন করেন যে, যদি শেষপর্যন্ত ছেড়েই দিতে হয়, তবে তা এখনই কেন করা হবে না? তাঁর এই তীব্র ও মোক্ষম যুক্তির সামনে পুলিশকর্মীরা কোনো স্পষ্ট ও সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রিয়া নিজেই অকপটে স্বীকার করেছেন যে, বাইরে থেকে তাঁকে অত্যন্ত শান্ত বা সাহসী দেখালেও, সেই মুহূর্তে ভেতরে ভেতরে তিনি ভীষণভাবে ভয় পেয়েছিলেন এবং আতঙ্কে তাঁর শরীর কাঁপছিল। তবুও নিজের ভিতরের সমস্ত ভয়কে জয় করে তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদে অটল থেকেছেন। শেষমেশ তাঁর তীব্র প্রতিবাদের মুখেই পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এবং মুক্তি পাওয়ার পর বহু সাধারণ মানুষ ও পড়ুয়ারা এগিয়ে এসে রিয়াকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান ও তাঁর সঙ্গে হাত মেলান।

রিয়া স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে এই সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার পেছনে তাঁর বিন্দুমাত্র কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। সম্পূর্ণ পরিস্থিতি এবং চোখের সামনে ঘটে চলা অন্যায় দেখে তিনি তাৎক্ষণিক ও স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি এও ভেবেছিলেন যে পুলিশের এই কাজে বাধা দেওয়ার ফলে হয়তো তাঁর নিজের বিরুদ্ধেও এফআইআর (FIR) হতে পারে কিংবা তাঁকে দীর্ঘ আইনি জাঁতাকলে আটক থাকতে হতে পারে। তা সত্ত্বেও তিনি পিছু হটেননি, কারণ তাঁর নিখাদ বিশ্বাস ছিল যে একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সেদিন ওই প্রতিবাদ না করলে নিজের বিবেকের কাছে তিনি চিরকালের মতো ছোট হয়ে যেতেন। এই একক সাহসিকতার ঘটনাটি মুম্বইয়ের নিট প্রশ্নফাঁস প্রতিবাদের একটি অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর এই ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই রাতারাতি তিনি জাতীয় স্তরে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন। ঘটনার পর রিয়া নিজে তাঁর সেই ভাইরাল হওয়া ছবি ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে শেয়ার করে দেশের যুবসমাজ ও সচেতন নাগরিকদের মনে এক গভীর নাড়া দিয়েছেন।