ইরান সংঘাতের জেরে কোকা-কোলার দামে বড় ধাক্কা! পকেটে টান পড়তে চলেছে আমজনতার

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র ইরান সংঘাত এখন সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে ভারতের কোমল পানীয়ের বাজারে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটায় বিশ্বখ্যাত কোমল পানীয় প্রস্তুতকারক সংস্থা কোকা-কোলা ভারতে তাদের জনপ্রিয় পানীয় ডায়েট কোকের দাম ১০ শতাংশের বেশি বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে সংস্থাটি এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আকারে বড় এবং তুলনামূলকভাবে অনেকটাই দামি অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে। যার ফলে বাজারের এই আকস্মিক পরিবর্তনের সরাসরি আর্থিক চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তাদের পকেটে।
এই মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহের ঘাটতির পিছনে সবচেয়ে বড় মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর প্রতিবন্ধকতা। সংশ্লিষ্ট ওয়াকিবহাল সূত্রের মতে, ভারতে অ্যালুমিনিয়াম ক্যান ও তার প্রয়োজনীয় কাঁচামাল নিরাপদভাবে সরবরাহের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সংঘাত মোকাবেলায় সম্প্রতি ঘোষিত অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ায় এই অত্যন্ত ব্যস্ত সমুদ্রপথে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল আবারও চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে বাজারে ক্যানের সহজলভ্যতা এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে গেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে দাম বেড়ে গেছে। কাঁচামালের এই তীব্র সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে কোকা-কোলা বিকল্প উৎস থেকে চড়া দামে ক্যান সংগ্রহ করছে।
বাজারের চাহিদা মেটাতে কোম্পানিটি ৩০ মিলিমিটারের প্রচলিত ক্যানের পরিবর্তে নতুন ৩৩০ মিলিমিটারের ক্যান বাজারে নিয়ে এসেছে। ইতিপূর্বে ভারতে ডায়েট কোক সাধারণত ৪০ টাকার বিনিময়ে ৩০০ মিলিগ্রামের অ্যালুমিনিয়াম ক্যানে বিক্রি হতো। তবে ছোট আকারের ক্যানের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতির জেরে কোম্পানিটি এখন ৫০ টাকার বিনিময়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি ৩৩০ মিলি লিটারের ক্যান চালু করেছে। যদি প্রতি মিলি লিটারের হিসেবে সঠিক হিসাব কষা হয়, তবে গ্রাহকদের বর্তমান বাজারে প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। যদিও এই ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কোকা-কোলা করপোরেট সংস্থার পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা করা হয়নি এবং তারা এই বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রেখেছে।
শুধু ক্যান নয়, বাজারে পণ্যের সরবরাহ সচল রাখতে বিকল্প হিসেবে কাচের বোতলের ব্যবহারও শুরু হয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রের খবর অনুযায়ী, ভারতে কোকা-কোলার অন্যতম প্রধান বোতলজাতকরণ অংশীদার অত্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য ২০০ মিলিলিটারের কাচের বোতলেও ডায়েট কোক বিক্রি শুরু করেছে। তবে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য একটি বিষয় স্পষ্ট যে, এই কাচের বোতলগুলোর দাম প্রথাগত ক্যানের তুলনায় কিছুটা বেশি রাখা হয়েছে। মূলত বাজারে এই জনপ্রিয় পানীয়টির সহজলভ্যতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্যই কোম্পানিটি এই বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
ভারত যেহেতু বর্তমানে কোকা-কোলা এবং পেপসি উভয়ের জন্যই বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও দ্রুত বর্ধনশীল ভোক্তা বাজার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, তাই এখানকার ছোটখাটো পরিবর্তনও বড় প্রভাব ফেলে। ভারতে তাদের উৎপাদিত বেশিরভাগ কোমল পানীয় প্রধানত প্লাস্টিক ও কাচের বোতলে বিক্রি করা হলেও, ডায়েট কোক মূলত অ্যালুমিনিয়ামের ক্যানেই পাওয়া যায়। এই কারণেই ডায়েট কোকের সরবরাহ বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য-সচেতন তরুণ ভোক্তাদের মধ্যে ডায়েট কোকের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে, কোম্পানির অপর জনপ্রিয় চিনিমুক্ত ব্র্যান্ড ‘কোক জিরো’ আপাতত এই ভয়াবহ সরবরাহ সংকট থেকে সম্পূর্ণ রক্ষা পেয়েছে, কারণ এটি প্লাস্টিকের বোতল এবং অ্যালুমিনিয়াম ক্যান—উভয় আকারেই বাজারে সহজলভ্য।
এদিকে, বাজারে ডায়েট কোকের এই আকস্মিক ও তীব্র ঘাটতি দেশের একশ্রেণির উদ্যোক্তার কাছে দারুণ এক ব্যবসায়িক সুযোগে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে দেশের বহু নামী পাব এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা এই ঘাটতির পূর্ণ সুযোগ নিয়ে বিশেষ “ডায়েট কোক পার্টি” আয়োজন করতে শুরু করেছে। এই ব্যতিক্রমী পার্টিগুলোতে প্রবেশমূল্যের নির্দিষ্ট বিনিময়ে অতিথিদের সুস্বাদু ডায়েট কোক, মনমাতানো গানবাজনা এবং অন্যান্য হাই-প্রোফাইল বিনোদনমূলক অভিজ্ঞতা প্রদান করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে এটি স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যের দূরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব এখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্য এবং সেগুলোর আকাশচুম্বী দামের ওপর সরাসরি এসে পড়েছে।