মাসে ২ লক্ষ টাকা আয় করেও সর্বস্বান্ত! আইটি কর্মীর কাহিনীতে তোলপাড় নেটদুনিয়া

মাসের পর মাস ঘাম ঝরিয়ে ২ লক্ষ টাকা বেতন পাওয়ার পরও কীভাবে একজন মানুষ চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে পারেন, তা নিয়ে বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে তীব্র আলোচনা। বিলাসবহুল জীবনযাত্রা এবং উচ্চ বেতনের চাকরি মানেই যে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য, এই ধারণাকে পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত করে সম্প্রতি ইন্টারনেট দুনিয়ায় আলোড়ন তুলেছে এক ২৭ বছর বয়সী আইটি পেশাজীবীর মর্মান্তিক আর্থিক সংকটের কাহিনী। জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম রেডিটে এই যুবকের শেয়ার করা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্তমান প্রজন্মের ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।

রেডিট ব্যবহারকারী @lonewolf_2298 ছদ্মনামের ওই আইটি কর্মী জানিয়েছেন যে, তাঁর মাসিক আয় দুই লক্ষ টাকা হওয়া সত্ত্বেও তিনি বর্তমানে হ্যান্ড-টু-মাউথ অর্থাৎ বেতনের ওপর নির্ভর করে দিন কাটাচ্ছেন এবং পাহাড়প্রমাণ ঋণের বোঝায় পিষ্ট। জীবনের একাধিক বড় পরিবর্তন এবং আকস্মিক কিছু ঘটনার জেরে তাঁর সমস্ত সঞ্চয় তো শেষ হয়েছেই, উল্টে তিনি জড়িয়ে পড়েছেন গভীর আর্থিক ঋণের জালে।

মূলত বিয়ে এবং নতুন শহরে স্থানান্তরের উচ্চ ব্যয়ই তাঁর এই দুরবস্থার প্রধান কারণ বলে জানিয়েছেন ওই যুবক। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, অত্যন্ত কম সময়ের ব্যবধানে তাঁর জীবনে বেশ কয়েকটি বড় ঘটনা ঘটে যায়। প্রথমে তাঁর বিবাহ সংক্রান্ত খরচ, এরপর পরিবারের জরুরি আর্থিক চাহিদা মেটানো এবং সবশেষে আজ থেকে প্রায় ৮-৯ মাস আগে কাজের সুবাদে একটি নতুন মেট্রো শহরে পাকাপাকিভাবে শিফট করার খরচ তাঁর সমস্ত হিসাবনিকেশ উল্টে দেয়। নতুন শহরের আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, নতুন ফ্ল্যাটের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র কেনা, ঘরের নানা জিনিসপত্র এবং মোটা অঙ্কের সিকিউরিটি ডিপোজিট জমা দিতে গিয়ে তাঁর বাজেট সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন তাঁর স্ত্রী হঠাৎ করেই চাকরি হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হিসেবে সমস্ত অর্থনৈতিক দায়িত্ব একা তাঁর কাঁধে এসে চাপে। এই আকস্মিক চাপ সামলাতে গিয়ে তিনি কোনো উপায় না পেয়ে ক্রেডিট কার্ড এবং বিভিন্ন ইএমআই ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যা পরবর্তীতে তাঁর জন্য এক বিরাট ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়।

নিজের ঋণের সম্পূর্ণ ও ভয়ংকর বিবরণ দিয়ে ওই প্রযুক্তিবিদ জানান যে, বর্তমানে তাঁর কাঁধে চার ধরণের বড় ঋণ রয়েছে। প্রথমত, এক আত্মীয়ের কাছ থেকে তিনি ২০ লক্ষ টাকা ধার নিয়েছেন যার জন্য প্রতি মাসে তাকে ২৫,০০০ টাকা করে কিস্তি দিতে হয়। দ্বিতীয়ত, একটি ব্যক্তিগত বা পার্সোনাল লোন রয়েছে যার ইএমআই বাবদ প্রতি মাসে দিতে হয় আরও ২৫,০০০ টাকা। তৃতীয়ত, ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া ঋণ হিসেবে তাকে প্রতি মাসে প্রায় ৩০,০০০ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে, যদিও আগামী দুই মাসের মধ্যে এটি সম্পূর্ণ শোধ হয়ে যাবে বলে তিনি আশা করছেন। চতুর্থত, একটি বিশেষ ঋণ যার পরিমাণ ২.২ লক্ষ টাকা এবং এটি নেওয়া হয়েছে প্রায় ৬ লক্ষ টাকার একটি মিউচুয়াল ফান্ড বন্ধক রেখে।

এই ঘটনার পর ওই যুবকের শেয়ার করা বাজেট এবং জীবনযাত্রার বিবরণ নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। লাখ লাখ মানুষ এই পোস্টটি পড়ার পর নিজেদের মন্তব্য এবং পরামর্শ দেওয়া শুরু করেছেন। অনেকেই আইটি সেক্টরের এই চাকচিক্যময় জীবনের পেছনের অন্ধকার দিক নিয়ে মুখ খুলেছেন। কিছু সচেতন ব্যবহারকারী তাঁকে অবিলম্বে সমস্ত অপ্রয়োজনীয় এবং বিলাসিতাপূর্ণ খরচ বন্ধ করে সম্পূর্ণ মনোযোগ ঋণ পরিশোধের দিকে দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।

এক অভিজ্ঞ রেডিট ব্যবহারকারী মন্তব্য করে লিখেছেন, “টাকার অঙ্ক যতই বড় হোক না কেন, সবার আগে একটি জরুরি আপৎকালীন বা ইমার্জেন্সি ফান্ড তৈরি করা বাধ্যতামূলক, আর তারপর যত দ্রুত সম্ভব সমস্ত ঋণ থেকে মুক্ত হওয়া উচিত।” অন্য এক নেটনাগরিক সতর্ক করে লিখেছেন, “নিজের আয়ের একটি বড় অংশ যদি এভাবে বেপরোয়াভাবে ঋণের জালে জড়িয়ে খরচ করা হয়, তবে তা এক বিরাট বিপদ ডেকে আনে। জীবনযাত্রায় নিজের প্রকৃত প্রয়োজন, মনের ইচ্ছা এবং ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের মধ্যে সবসময় একটি সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা উচিত।”