আইফোন অর্ডারে বিয়ার্ড অয়েল! ফ্লিপকার্টকে ১.১১ লক্ষ টাকা জরিমানার নির্দেশ আদালতের

মুম্বইয়ে অনলাইন শপিংয়ের নামে এক অভিনব প্রতারণার ঘটনায় ই-কমার্স জায়ান্ট ফ্লিপকার্ট এবং সংশ্লিষ্ট বিক্রেতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ করল ক্রেতা সুরক্ষা আদালত। আইফোন-14 প্রো অর্ডার করে পার্সেলের ভেতরে দাড়ি কাটার তেল বা বিয়ার্ড অয়েল হাতে পাওয়ার ওই চাঞ্চল্যকর মামলায় ফ্লিপকার্ট ও বিক্রেতাকে যৌথভাবে প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। মুম্বইয়ের পাওয়াই এলাকার বাসিন্দা এক ক্রেতার দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছে ‘ডিস্ট্রিক্ট কনজিউমার ডিসপিউটস রিড্রেসাল কমিশন’। গ্রাহক সুরক্ষা আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ই-কমার্স সংস্থাগুলির দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের বিরুদ্ধে এই রায় এক বিরাট মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল মুম্বইয়ের পাওয়াই এলাকার ওই বাসিন্দা ফ্লিপকার্ট অ্যাপের মাধ্যমে ‘নো-কস্ট ইএমআই’ সুবিধা ব্যবহার করে ১,১৮,৭৯৩ টাকা মূল্যে একটি অ্যাপল আইফোন-14 প্রো (128 জিবি) বুক করেছিলেন। নির্দিষ্ট দিনে আলাদাভাবে চার্জার ও ফোনের কভার তাঁর কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে গেলেও, তার ঠিক একদিন পরে আসা মূল পার্সেলটি খোলার পরেই তাঁর চোখ কপালে ওঠে। তিনি দেখেন, লাখ টাকার বহুমূল্য স্মার্টফোনের পরিবর্তে বাক্সের ভেতরে রয়েছে সামান্য কিছু প্যাকিং সামগ্রী এবং একটি দাড়িতে মাখার তেল!

এই মারাত্মক ভুল সামনে আসার পরই ওই গ্রাহক তৎক্ষণাৎ ফ্লিপকার্টের কাস্টমার সাপোর্ট টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণের ছবি জমা দেন। কিন্তু অভিযোগকারীর অভিযোগ, ই-কমার্স সংস্থার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সন্তোষজনক পদক্ষেপ করা তো দূরের কথা, উল্টে তাঁর সমস্ত অভিযোগের টিকিট বারবার কোনো সুরাহা ছাড়াই বন্ধ বা ‘ক্লোজ’ করে দেওয়া হয়। বারবার প্রতিকার চেয়েও কোনো সুফল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তিনি ক্রেতা সুরক্ষা আদালতের দ্বারস্থ হন।

মামলার শুনানিতে আদালত ফ্লিপকার্টের তীব্র সমালোচনা করে সাফ জানিয়েছে যে, একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কোনো সামগ্রীর বিক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর গ্রাহক ও বিক্রেতার মধ্যে লেনদেন থেকে কিছুতেই নিজেদের দায় এড়াতে পারে না—বিশেষ করে যখন ক্রেতা তাৎক্ষণিকভাবে ভুল পণ্য সরবরাহের অভিযোগ জানাচ্ছেন। আদালত জানায়, অভিযোগের তদন্ত না করে, ভুল পার্সেলটি উদ্ধার না করে এবং কোনো কার্যকরী সমাধান ছাড়াই বারবার অভিযোগ ক্লোজ করে দেওয়া—এসব গ্রাহক পরিষেবার ক্ষেত্রে চরম গাফিলতি এবং এক ধরনের স্পষ্ট ‘অনৈতিক বাণিজ্যিক কার্যকলাপ’-এর শামিল।

পাশাপাশি, এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল ভ্যালু রিটেইল প্রাইভেট লিমিটেড’-এর ভূমিকা নিয়েও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিচারকদের প্যানেল। আদালতের পর্যবেক্ষণ, বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও বিক্রেতা চুক্তিবদ্ধ আসল পণ্য সরবরাহ করেনি এবং গ্রাহকের সমস্যার কোনো সুরাহা করেনি, যা তাদের গ্রাহক পরিষেবায় বড়সড় খামতিরই স্পষ্ট প্রমাণ।

কমিশন তাঁর রায়ে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, অভিযোগকারীর যে মানসিক ক্ষতি ও আর্থিক হয়রানি হয়েছে, তার জন্য অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম ফ্লিপকার্ট এবং সংশ্লিষ্ট বিক্রেতা উভয়েই যৌথভাবে এবং পৃথকভাবে দায়ী। আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, অভিযুক্তদের অবিলম্বে ওই গ্রাহককে ১,১১,৭৯৩ টাকা সম্পূর্ণ ফেরত দিতে হবে। এর পাশাপাশি, ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল থেকে প্রকৃত অর্থ পরিশোধের দিন পর্যন্ত এর ওপর বার্ষিক ৯ শতাংশ হারে সুদও মেটাতে হবে। সব মিলিয়ে জরিমানার এই মোট পরিমাণ ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বিচারকদের প্যানেল তাদের রায়ে এও উল্লেখ করেছে যে, প্রথম পক্ষের অর্থাৎ ফ্লিপকার্টের এটা নিশ্চিত করা নৈতিক দায়িত্ব যে উপভোক্তা যেন সর্বদা তাঁর অর্ডার করা সঠিক পণ্যটিই হাতে পান এবং গ্রাহকদের যেকোনো অভিযোগের দ্রুত ও সঠিক সমাধানের জন্য একটি কার্যকরী ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা যেন তারা অবিলম্বে তৈরি করে।