কলকাতা কি হতে চলেছে ভারতের পরবর্তী বিজনেস ক্যাপিটাল? পর্যটন মন্ত্রীর বড় ঘোষণায় তোলপাড় রাজ্য!

বিধানসভায় পর্যটন দফতরের বাজেট পেশ করার ঠিক পরপরই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রাজ্যের পর্যটন শিল্প নিয়ে সরকারের সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরলেন রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী শংকর ঘোষ। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আগামী দিনে পূর্ব ভারতের মধ্যে কলকাতাকে অন্যতম প্রধান এবং আধুনিক পর্যটন ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের প্রাথমিক ও প্রধান লক্ষ্য।

এই প্রসঙ্গে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে গিয়ে পর্যটন মন্ত্রী অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “আমরা কলকাতাকে খুব শীঘ্রই ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার প্রাইম মাইস (MICE) ক্যাপিটাল হাব হিসেবে গড়ে তুলব।” এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সফলভাবে বাস্তবায়িত করতে পর্যটন দফতরের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ ‘মাইস ব্যুরো’ গঠন করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের মধ্যে এই বিশেষ ব্যুরোর হাত ধরে রাজ্যে অন্তত দু’হাজারটি ছোট-বড় কনভেনশন বা ইভেন্ট আয়োজনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজ্যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন ও আয়ের অপার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এই প্রসঙ্গে মন্ত্রী আরও যোগ করেন, “এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকার বিশাল ব্যবসা হবে। শুধুমাত্র কলকাতাকে সামনে রেখেই আমরা এমন এক আর্থিক পরিকাঠামো তৈরি করব, যা বর্তমান সরকারের সামগ্রিক রেভিনিউ কালেকশনকে এক ধাক্কায় অনেক দূর এগিয়ে দেবে। সেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে পর্যটন দফতর সবচেয়ে বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।”

দেশ ও বিদেশের নামী-দামি বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থাকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কলকাতায় টেনে আনার পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত দুর্গাপুজোকেও এই বিশাল মাইস পরিকল্পনার মূল ধারার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। মন্ত্রী জানান, কলকাতায় বড় ধরনের কোনো কনফারেন্স বা আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজিত হলে তার সাথে হোটেল শিল্প, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং খাদ্য শিল্প সরাসরি ও ওতোপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। গোয়া বা দিল্লির মতো সফল বাণিজ্য শহরগুলোর উদাহরণ টেনে মন্ত্রী বুঝিয়ে দেন, কলকাতাকেও ঠিক সেই একই আন্তর্জাতিক ধাঁচে একটি প্রিমিয়ার ডেস্টিনেশন হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

তবে শুধুমাত্র কলকাতাকে কেন্দ্র করেই এই মাস্টারপ্ল্যান সীমাবদ্ধ নেই। সুন্দরবন, দীঘা, মন্দারমণি, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম এবং দার্জিলিংয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর জায়গাগুলোকেও পর্যটকদের কাছে সমানভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অতীতে ভিনরাজ্যের বিভিন্ন পর্যটন মেলায় পশ্চিমবঙ্গের উপস্থিতি সেভাবে চোখে না পড়লেও, এখন থেকে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি পর্যটন মেলায় রাজ্য 적극ভাবে অংশগ্রহণ করবে এবং জোরদার প্রচার চালাবে। পাশাপাশি, বিদেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাঙালিদের বিভিন্ন প্রভাবশালী সংগঠনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপন করে তাদের রাজ্যের পর্যটন ও অর্থনীতির সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত করার প্রশংসনীয় কাজও ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

পর্যটনকে পূর্ণাঙ্গ শিল্পের মর্যাদা দিয়ে রাজ্যে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ টানার উদ্দেশ্যে ক্যাশ এবং নন-ক্যাশ ইনসেনটিভ বা বিশেষ সুবিধার কথাও এদিন ঘোষণা করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করার জন্য ইতিমধ্যেই দফতরে একটি বিশেষ ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে এবং রাজ্যের সমস্ত হোম-স্টে মালিক, হোটেল ব্যবসায়ী ও ট্যুর অপারেটরদের কাছে বিস্তারিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

নন-ক্যাশ সুবিধার বিষয়টি স্পষ্ট করে মন্ত্রী বলেন, “কোনো রকম প্রত্যক্ষ অর্থ খরচ ছাড়াই শুধুমাত্র কিছু আইনি সংস্কার বা আইনি সুযোগ-সুবিধা আমরা বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দিতে পারি।” তিনি আরও পরিষ্কার করেন যে, আইনি পরিকাঠামো লঙ্ঘন না করে কোনো ভবনে অতিরিক্ত তলা নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার মতো বিষয়গুলোও এই সুবিধার আওতাধীন। বিনিয়োগকারীদের সমস্ত ধরনের প্রশাসনিক হয়রানি থেকে মুক্ত করতে একটিমাত্র ছাতার তলায় সমস্ত অনুমোদন পাওয়ার সুবিধা দিতে ‘সিঙ্গল উইন্ডো পলিসি’ চালুর জোরালো চিন্তাভাবনাও চলছে। অন্যদিকে, সরাসরি আর্থিক ছাড় বা জমির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দিতে ক্যাশ ইনসেনটিভের কথাও ভেবে রেখেছে সরকার।

উৎসবপ্রেমী বাঙালিদের জন্য একটি বিশেষ সুখবর দিয়ে মন্ত্রী জানান, দুর্গাপুজোর সময় যে সমস্ত বাঙালিরা ভিনরাজ্যে ঘুরতে চলে যান, তাঁদের বাংলার মাটিতেই পুজোমুখী করতে একটি বিশেষ পুজো প্যাকেজ নিয়ে আসছে পর্যটন দপ্তর। ‘ট্যুরিজম ফর অল’ বা সকলের জন্য পর্যটন নীতির ওপর সরকার সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। কলকাতার বিখ্যাত ও বনেদি পুজোগুলির পাশাপাশি গ্রামবাংলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যমণ্ডিত পারিবারিক পুজোগুলিকে পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরতে বর্তমানে নিবিড় ম্যাপিংয়ের কাজ চলছে।