বুলেট ট্রেন প্রযুক্তিতে বিরাট বিপ্লব ভারতের! নিজস্ব সিগন্যালিং সিস্টেমে কী এমন চমক আনছে রেল?

ভারত এখন বুলেট ট্রেন প্রযুক্তিতে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ করতে চলেছে। ভারতীয় রেলের পক্ষ থেকে নিজস্ব দেশীয় প্রযুক্তিতে উচ্চ-গতির রেল সিগন্যালিং এবং আধুনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে, যার আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভারত ট্রেন কন্ট্রোল সিস্টেম’ বা বিটিসিএস (BTCS)। বিশেষভাবে ভারতীয় ভূখণ্ড ও চাহিদার কথা মাথায় রেখেই এই অত্যাধুনিক ব্যবস্থাটি তৈরি করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের প্রায় ৭,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রস্তাবিত বিশাল বুলেট ট্রেন নেটওয়ার্কের জন্য বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে সাহায্য করবে। রেল মন্ত্রকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, সম্পূর্ণ ওপেন-সোর্স প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে এই সিস্টেমটি তৈরি করা হবে, যার ফলে এর উৎপাদন খরচ যেমন অনেক কম থাকবে, তেমনই দেশজুড়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন দ্রুতগতির রেল প্রকল্পের নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী এটিকে খুব সহজেই মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। কর্মকর্তারা আরও আশাবাদী যে আগামী দিনে এই সফল দেশীয় প্রযুক্তি অন্যান্য বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলিকেও বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উপলব্ধ করা যেতে পারে।
নতুন এই দেশীয় ব্যবস্থাটি সফলভাবে গড়ে তুলতে ভারতীয় রেল ইতিমধ্যেই চলমান অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মুম্বাই-আহমেদাবাদ হাই-স্পিড রেল (MAHSR) প্রকল্প থেকে অর্জিত দীর্ঘমেয়াদী অভিজ্ঞতাকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগাচ্ছে। উল্লেখ্য, এই চলমান প্রকল্পে বর্তমানে ইউরোপীয় ট্রেন কন্ট্রোল সিস্টেম (ETCS) লেভেল ২ সিগন্যালিং ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত অবিশ্বাস্য গতিতে ট্রেনগুলিকে অত্যন্ত নিরাপদে পরিচালনা করতে সক্ষম। গত বছরের জুন মাসে ন্যাশনাল হাই স্পিড রেল কর্পোরেশন লিমিটেড (NHSRCL) মুম্বাই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্পের বিশেষ সিগন্যালিং কাজের জন্য ভারতের দীনেশচন্দ্র আর আগরওয়াল ইনফ্রাকন এবং জার্মানির শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক সংস্থা সিমেন্সের একটি কনসোর্টিয়ামকে প্রায় ৪,১০০ কোটি টাকার একটি বিশাল চুক্তি প্রদান করেছিল।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, দেশের আগামী দিনের প্রস্তাবিত নতুন বুলেট ট্রেন করিডোরগুলির সুনির্দিষ্ট নকশা ও রুট পরিকল্পনা ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নাগাদ চূড়ান্ত সরকারি অনুমোদন লাভ করবে বলে জোরালো আশা করা হচ্ছে। এর ফলে দেশের দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্কের সামগ্রিক সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া আরও অনেক বেশি ত্বরান্বিত হবে। রেল কর্তৃপক্ষের সুদৃঢ় বিশ্বাস যে, নিজেদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা কন্ট্রোল সিস্টেম গড়ে তোলা হলে তা ভারতীয় দেশীয় সংস্থাগুলিকে উচ্চ-গতির রেলের আধুনিক সরঞ্জাম ও উন্নত প্রযুক্তি বিকাশের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য সুযোগ করে দেবে। এর ফলস্বরূপ রেল উৎপাদন খাতে দেশীয় উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বহু গুণে বৃদ্ধি পাবে।
প্রাথমিকভাবে মুম্বাই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্পটি জাপানের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় নির্মিত হলেও, এতে জাপানি ডিজিটাল অটোমেটিক ট্রেন কন্ট্রোল সিস্টেমের পরিবর্তে ইউরোপীয় ইটিসিএস লেভেল-২ সিগন্যালিং ব্যবহার করা হচ্ছে। সম্প্রতি জাপানের প্রাক্তন মন্ত্রী হিদেকি মাকিহারা এই সংক্রান্ত বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। তবে রেল কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, জাপানি হিটাচি ট্রেনগুলি এই ইটিসিএস সিস্টেমের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভবিষ্যতে যদি জাপানি সংস্থাগুলি যথাযথ ও উপযুক্ত প্রস্তাব জমা দেয়, তবে ভারতও জাপানি সিগন্যালিং প্রোটোকল গ্রহণ করার বিষয়টি খোলা মনে বিবেচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে। সবমিলিয়ে, ভারতের মূল লক্ষ্য কেবল বুলেট ট্রেন চালানোই নয়, বরং এই খাতের মূল প্রযুক্তিগুলিতে সম্পূর্ণ স্বনির্ভরতা অর্জন করা।