নিট কাণ্ডে তোলপাড় দেশ, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল রাজধানী, আসরে নামলেন অলিম্পিক সোনাজয়ী অভিনব বিন্দ্রা!

রাজধানী দিল্লি সহ গোটা দেশজুড়ে এখন প্রতিবাদের ঝড় বইছে। নিট-কাণ্ডের জেরে শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে সর্বত্র। রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার পড়ুয়া। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সম্পূর্ণ অনড় গোটা ছাত্রসমাজ। ঠিক এই স্পর্শকাতর সময়েই ময়দানে অবতীর্ণ হলেন অলিম্পিক্সে দেশের প্রথম ব্যক্তিগত সোনাজয়ী শুটার অভিনব বিন্দ্রা। সাধারণত রাজনীতির ময়দান বা বিতর্কিত বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখতেই পছন্দ করেন এই কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ। কিন্তু দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন বেনজির দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় তিনি আর নীরব থাকতে পারেননি। বরং সরাসরি কলম ধরে অত্যন্ত শাণিত ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, সমাজের প্রতি কিছু মৌলিক দায়বদ্ধতা প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করে অভিনব বিন্দ্রা এক অমোঘ সত্য তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বর্তমানের এই সংকটজনক পরিস্থিতি শুধুমাত্র গুটিকয়েক পরীক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি গোটা দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য অত্যন্ত গভীর চিন্তার বিষয়। সমাজের প্রতিটি স্তরে মেধার অবমূল্যায়ন যে কোনও একটি সুস্থ জাতির জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক হতে পারে। নিজের ভেরিফায়েড এক্স হ্যান্ডেলে (পূর্বতন টুইটার) তিনি পরিষ্কার ভাষায় লিখেছেন যে, তিনি কখনই নিজেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মনে করেন না, কিন্তু তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস কিছু কিছু বিষয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে এবং তা আমাদের সকলের। এখানে কেউ কোন রাজনৈতিক পক্ষে অবস্থান করছেন, তা মোটেও বিবেচ্য বিষয় নয়। শিক্ষা ঠিক তেমনই একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একটি দেশের প্রকৃত শক্তির পরিমাপ কেবল তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বা আন্তর্জাতিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না, বরং দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য তারা ঠিক কী ধরনের পরিকাঠামো ও সুযোগ তৈরি করছে, সেটাই আসল মাপকাঠি।

বর্তমান সময়ে ছাত্র আত্মহত্যার মতো একাধিক মর্মান্তিক ঘটনার আবহে একটি সুস্থ ও সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক পরিকাঠামোর পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন বিন্দ্রা। তাঁর স্পষ্ট অভিমত হলো, দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থা ছাড়া কোনও দেশেরই প্রকৃত বা টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। যে শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মনে আত্মবিশ্বাস জোগায়, প্রকৃত মেধার সঠিক কদর করে এবং মনের ভেতরকার কৌতূহলকে লালন করে, সেটিই সবসময় একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করে। দেশজুড়ে চলমান প্রশ্নফাঁস বিতর্কের জেরে যখন শিক্ষা পরিকাঠামো নিয়ে মারাত্মক প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে, তখন অভিনব বিন্দ্রার এই মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। তিনি আরও লিখেছেন, আমাদের সকলের উচিত দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তোলা, যাতে এটি আগামী প্রজন্মের কাছে নিরন্তর সুযোগ, নতুন উদ্ভাবন এবং আশার একমাত্র উৎস হয়ে ওঠে।

এদিকে, এই লাগাতার বিক্ষোভের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আঁচ ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও। দেশজুড়ে চলা এই নজিরবিহীন ডামাডোলের মধ্যেই এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যুতে মুখ খুলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রশ্নফাঁসের মতো দুর্নীতিতে জড়িত দোষীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন যে, দেশের যুবসমাজের কল্যাণ ও তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিচ্ছু হতে পারে না। প্রশ্নফাঁসের চক্রের সঙ্গে যারা যারা সরাসরি জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যেই ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সমস্ত কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পড়ুয়াদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে সরকারের এই ধারাবাহিক উদ্যোগের এটি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যারা দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করবে, তাদের একচুলও ছাড় দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর এই কড়া আশ্বাসের পরেও রাজধানীর যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের আগুন এক ফোঁটাও কমে নি। বরং যন্তর মন্তরে লাগাতার অবস্থানে বসে সরকারের ওপর চাপ বজায় রেখেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। প্রশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র স্লোগানে মুখর হয়ে এই সংগঠন আন্দোলন আরও জোরালো করে তুলেছে। তাদের প্রধান ও একমাত্র দাবি হলো—শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। দুর্নীতির শেকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এই ইস্তফা অত্যন্ত জরুরি বলেই মনে করছেন আন্দোলনরত পড়ুয়ারা। সব মিলিয়ে রাজধানীর রাজপথ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল, সব জায়গাতেই উত্তেজনার পারদ চড়ছে।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty