সিকিমের সুড়ঙ্গ দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু! মিথেন বিস্ফোরণে ২২ জনের প্রাণহানির ঘটনায় শোকের ছায়া!

সোমবার সিকিমের নামচিতে একটি নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে ভয়াবহ মিথেন গ্যাস বিস্ফোরণের জেরে সংঘটিত ধস দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২২ জনে দাঁড়িয়েছে। দুর্ঘটনার সময় সুড়ঙ্গের ভেতরে মোট ২৫ জন শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। বুধবার রাত পর্যন্ত উদ্ধারকাজ চালিয়ে মোট ২২টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, বাকি তিনজন নিখোঁজ শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করার সম্ভাবনা এখন আর প্রায় নেই বললেই চলে। নামচির পুলিশ সুপার সোনম ডোলমা জানিয়েছেন যে, শুধুমাত্র বুধবার রাতেই উদ্ধারকারী দল নয়টি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। অন্যদিকে, জেলা তথ্য আধিকারিকের সূত্রে জানা গেছে যে, বৃহস্পতিবার সকালের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দলগুলি ফের ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু করেছে এবং নিখোঁজ বাকি শ্রমিকদের সন্ধানে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছে।

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো শ্রমিকদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার চারজন স্থায়ী বাসিন্দা রয়েছেন। এছাড়াও পঞ্জাব, উত্তরাখণ্ড, অসম এবং সিকিমের একজন করে শ্রমিকের মৃতদেহ ইতিমধ্যেই শনাক্ত করা হয়েছে। ঝাড়খণ্ডের খুঁটি, হাজারিবাগ এবং পশ্চিম সিংভূম জেলার বেশ কয়েকজন শ্রমিকও এই মেগা প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে সুড়ঙ্গের ভেতর মিথেন গ্যাসের আকস্মিক বিস্ফোরণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এনএইচপিসির (NHPC) প্রকাশিত সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, সুড়ঙ্গের শিলাস্তরের অন্তভাগে আটকে থাকা মিথেন গ্যাস হঠাৎ বিস্ফোরিত হওয়ার ফলে পুরো সুড়ঙ্গ চত্বর ঘন কালো ধোঁয়া এবং বিষাক্ত গ্যাসে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। বিষাক্ত গ্যাসের এমন মারাত্মক প্রভাবে সুড়ঙ্গের ভেতর একটানা ৪৫ মিনিটের বেশি সময় ধরে উদ্ধারকাজ চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলিকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার পিঠে বেঁধে সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করতে হচ্ছে, যা গোটা অপারেশনটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

স্থানীয় এটিএনএম (ATNM) হাসপাতালের ময়না তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে শ্রমিকদের শরীরে তীব্র শ্বাসরোধ এবং পুড়ে যাওয়ার স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জোরালো অনুমান, মিথেন গ্যাস অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সুড়ঙ্গের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ার কারণে কর্মরত শ্রমিকরা নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার বা বাঁচার ন্যূনতম সুযোগও পাননি। উদ্ধারকাজ আরও দ্রুত ও নিখুঁত করার উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে আগেই একটি বিশেষ দল পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে আসানসোলের ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেডের (ECL) আরও একটি উচ্চমানের বিশেষজ্ঞ দল বুধবার রাত সাড়ে দশটা নাগাদ সরাসরি ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায় এবং উদ্ধার অভিযানে যুক্ত হয়ে একের পর এক মৃতদেহ বাইরে নিয়ে আসে। তবে এখনও পর্যন্ত সমস্ত মৃতদেহ যথাযথভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।

এদিকে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত প্রতিটি শ্রমিকের শোকার্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে বড় অংকের আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করেছে এনএইচপিসি কর্তৃপক্ষ। সংস্থার পক্ষ থেকে মৃতদের পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি, সিকিম রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও নিহতদের পরিবারকে ৪ লক্ষ টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এই বিপর্যয়ে গভীর শোক প্রকাশ করে মৃতদের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। প্রশাসনের তরফ থেকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানানো হয়েছে যে, নিখোঁজ থাকা প্রত্যেক শ্রমিকের সন্ধান না মেলা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান কোনোভাবেই থামবে না এবং তা সম্পূর্ণভাবে অব্যাহত থাকবে।