নিট আন্দোলনের আগুন এবার মুম্বইয়ে! হোয়াটসঅ্যালো লাইভ লোকেশন চেয়ে পড়ুয়াদের টার্গেট পুলিশের?

দিল্লির গণ্ডি ছাড়িয়ে নিট (NEET-UG) প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র নেতৃত্বে চলা ছাত্র আন্দোলন এবার আছড়ে পড়ল দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বইয়ে। রাজধানী দিল্লির পাশাপাশি মুম্বইয়েও আন্দোলন ক্রমশ তীব্র রূপ ধারণ করায় পুলিশ ও প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। শিবাজি পার্ক, চেম্বুর এবং আজাদ ময়দানের মতো মুম্বইয়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পয়েন্টে গত কয়েকদিন ধরে চলা লাগাতার বিক্ষোভের জেরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ এবার চরম ও নজিরবিহীন কড়াকড়ির পথ বেছে নিয়েছে। আন্দোলন যাতে কোনোভাবেই আর নতুন করে বিস্তার লাভ করতে না পারে এবং নতুন করে শিক্ষার্থীরা যোগ না দিতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে মুম্বই পুলিশ সরাসরি ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং আন্দোলনকারীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার মতো কৌশল গ্রহণ করেছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ইতিমধ্যেই যাদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে কিংবা যারা আগে আইনি নোটিশ পেয়েছেন, স্থানীয় থানা থেকে তাদের সরাসরি ফোন ও মেসেজ করা হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্ট ও ভেরিফায়েড স্ক্রিনশট থেকে জানা গিয়েছে যে, থানার উর্ধ্বতন আধিকারিকরা সংশ্লিষ্ট প্রতিবাদীদের গতিবিধি এবং আদালতের নির্দেশ নিখুঁতভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ‘লাইভ লোকেশন’ শেয়ার করার কঠোর নির্দেশ দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, ভোরের দিকে বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল উপায়ে ‘ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা’ (BNSS)-এর ৩৫(৩) ধারার অধীনে আইনি নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। এই নোটিশে প্রাপকদের আগের কোনো সমাবেশে অংশগ্রহণের বিষয়ে সরাসরি থানায় হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ডিজিটাল যোগাযোগের এই অভিনব পদ্ধতির পাশাপাশি মুম্বইয়ের বিভিন্ন শহরতলি ও পার্শ্ববর্তী পৌর এলাকায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বাড়িতে সরাসরি পুলিশি দল পাঠানো হচ্ছে। পুলিশ অফিসাররা সরাসরি পড়ুয়াদের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের তদন্তের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে অবহিত করছেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের জনসমাবেশে আর অংশ না নেওয়ার জন্য একপ্রকার স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। একই সঙ্গে, শহরের প্রধান মেট্রো স্টেশন এবং রেলওয়ে স্টেশনের সমস্ত প্রবেশপথের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী ও নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। এই পুলিশ কর্মীরা মূলত সমাবেশস্থলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করছেন এবং তাদের বাধা দিয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। রাস্তায় তল্লাশির সময় দ্রুত কাজ হাসিল করার জন্য পূর্বে আটক হওয়া ব্যক্তিদের ছবি, তথ্য এবং নথিপত্রও শহরের বিভিন্ন থানায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই কড়া পদক্ষেপগুলিকে মূলত ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁদের সাফাই, তরুণ প্রজন্ম যাতে কোনোভাবেই ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড বা আইনি জটিলতার কবলে না পড়ে এবং তাদের পাসপোর্ট প্রসেসিং, উচ্চশিক্ষার সুযোগ কিংবা ভবিষ্যতের চাকরি ও কর্মসংস্থানের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে না যায়, সেজন্যই এই আগাম সতর্কতা। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ানো মানবাধিকার আইনজীবী ও আইনি সহায়তা প্রদানকারী বিভিন্ন গোষ্ঠী এই পুলিশি পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা করেছে। তাদের জোরালো দাবি, ইলেকট্রনিক লোকেশন ট্র্যাকিং, সোশ্যাল মিডিয়া মেসেজ চেক করা এবং বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখানোর মতো এই ঘটনাগুলি সাধারণ প্রতিরোধমূলক প্রোটোকলের সমস্ত মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এগুলো প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সংবিধানে প্রদত্ত চলাফেরার স্বাধীনতার অধিকারের পরিপন্থী।

উল্লেখ্য, দিল্লিতে সিজেপি-র নেতৃত্বে চলা ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেই মুম্বইয়ে এই বিক্ষোভের সূচনা হয়েছে। দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপি সমর্থকরা যখন নিট-ইউজি ২০২৬ সহ সমস্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দুর্নীতি নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ ও শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবিতে অনড় অবস্থান বজায় রেখেছেন, ঠিক তখনই মুম্বইয়ের রাজপথেও তার প্রভাব স্পষ্ট। দিল্লির দমনপীড়নের প্রতিবাদে মুম্বইয়েও রাজনৈতিক কর্মী ও শিক্ষার্থীরা লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty