লোহার গরাদ ভেদ করে রাজস্থানের খোলামেলা জেলে প্রেমের জয়রথি! যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত দুই বন্দির জেলের ভেতরেই চোখধাঁধানো বিয়ে

লোহার গরাদ, কঠোর সাজা এবং চার দেওয়ালের বন্দি জীবন—সবকিছুর মাঝেও কখনও কখনও ভালোবাসা ঠিক নিজের পথ খুঁজে নেয়। আর সেই ভালোবাসাই এক নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখাল রাজস্থানের যোধপুরের মান্ডোর ওপেন জেল ক্যাম্পের দুই যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দিকে। দীর্ঘ দেড় বছরের গভীর পরিচয় থেকে প্রেম, আর সেই সম্পর্ককে আইনি ও সামাজিক পরিণতি দিতে অবশেষে কারাগারের ঠিক ভেতরেই একে অপরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন নাগৌরের বাসিন্দা মূলারাম এবং মুম্বইয়ের সীমা ঘাডসে। ভারতের বিচার ও কারা-ইতিহাসে সংশোধনমূলক বিচারব্যবস্থার এক অত্যন্ত বিরল ও যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত হিসেবে এই ঘটনাকে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
মূলারাম এবং সীমা, দু’জনেই পৃথক দুটি ফৌজদারি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। তবে কারাগারে তাদের ভালো আচরণের সদ্ব্যবহার ও মূলধারায় ফেরানোর কথা বিবেচনা করে তাঁদের রাজস্থানের মান্ডোর ওপেন জেল ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়েছিল। ওপেন জেলে সাধারণ কারাগারের তুলনায় বন্দিদের স্বাধীনতা কিছুটা বেশি থাকে। আর সেখানেই প্রতিদিনের মেলামেশার সুবাদে একে অপরের কাছাকাছি আসেন এই দুই বন্দি। ধীরে ধীরে সেই বন্ধুত্ব গভীর প্রেমে রূপান্তরিত হয়। প্রায় দেড় বছর একসঙ্গে সময় কাটানোর পর তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে, জীবনের বাকি পথ তাঁরা এভাবেই একে অপরের হাত ধরেই অতিবাহিত করবেন।
বিয়ে প্রসঙ্গে মুখ খুলে মূলারাম অত্যন্ত আবেগঘন কন্ঠে বলেন, “মানুষ বলে নাকি বিয়ে স্বর্গে ঠিক হয়, কিন্তু আমাদের বিয়ে ঠিক হয়েছে এই জেলের চার দেওয়ালের মাঝে। আমরা সমাজের মূল স্রোতে ফিরে যেতে চাই। আমাদের ভালো আচরণের কথা বিবেচনা করে ভবিষ্যতে সরকার যদি আমাদের সাজা কমিয়ে দেয় বা ক্ষমা করে দেয়, তবে আমরা সম্পূর্ণ নতুন করে এক স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারব।”
অন্যদিকে, ২০১৯ সাল থেকে স্বামীর খুনের মামলায় সাজা ভোগ করছেন সীমা ঘাডসে। মহারাষ্ট্রে থাকা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য জেলে এসে এই বিয়েতে উপস্থিত হতে পারেননি। ফলে জেলের ভেতরেই সীমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁর এক বান্ধবীর পরিবারের সদস্যরা। ফলোদির বাসিন্দা রাধাকিশন ভাগেলা সীমার অভিভাবক বা ‘বাবা’র দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন এবং তিনিই কাতারবন্দি অতিথিদের সামনে কন্যদান সম্পন্ন করেন। শুধু তাই নয়, তাঁর পরিবারই এই ঐতিহাসিক বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র ছাপিয়েছে এবং রাজস্থানের ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতি মেনে ‘মায়রা’ ও ‘প্রীতিভোজ’-সহ সমস্ত বিয়ের অনুষ্ঠানের জমজমাট আয়োজন করেছে।
শুরুতে মূলারামের আইনজীবী প্যারোলে মুক্তির আবেদন জানিয়েছিলেন, যাতে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে সমস্ত রীতিনীতি মেনে সামাজিকভাবে বিয়ে করা যায়। কিন্তু রাজস্থান হাইকোর্ট সম্পূর্ণ অন্য একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়। আদালত নির্দেশ দেয় যে, বিয়ে জেলের চার দেওয়ালের মধ্যেই সম্পন্ন হবে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বন্দিদের জীবনে ইতিবাচক মানসিক পরিবর্তন আনা এবং তাঁদের সমাজে পুনর্বাসনের পথকে আরও সুগম করা। আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী, এই ব্যতিক্রমী বিয়েতে ২১ জন বিশেষ অতিথিকে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। জেল ক্যাম্পের নির্দিষ্ট কোয়ার্টারেই সমস্ত অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় এবং বিয়ের সম্পূর্ণ আর্থিক খরচ বহন করেন খোদ মূলারাম।
সীমার অবশ্য কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে। তিনি জানান, “আমরা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে সমস্ত সামাজিক রীতি মেনে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। তবে আদালতের নির্দেশে জেলের মধ্যেই আমাদের বিয়ে সারতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমরা বেজায় খুশি।” মান্ডোর ওপেন জেল ক্যাম্পের এক দায়িত্বশীল নিরাপত্তারক্ষী জানান যে, শুধুমাত্র যাঁদের আচরণ দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত সন্তোষজনক থাকে, তাঁদেরই এই ওপেন জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। মূলারাম এবং সীমা সেই কঠোর পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ ছিলেন। তাই তাঁদের এই বিয়ে কেবল একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, বরং আধুনিক সংশোধনমূলক কারা-ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।