সিকিমের সুড়ঙ্গ দুর্ঘটনায় হু হু করে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা! সমরডুং টানেল ট্র্যাজেডিতে ২২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর তুঙ্গে উদ্ধারকাজ!

সিকিমের নামচি জেলার সমরডুং টানেলে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক সুড়ঙ্গ দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে একুশ পেরিয়ে বর্তমানে ২২ জনে দাঁড়িয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত ১১ জন বাদে বাকি মৃত শ্রমিকদের নাম ও পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তিস্তা স্টেজ-৬ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণাধীন ‘এডিআইটি-৩’ (ADIT-III) সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকা বাকি শ্রমিকদের উদ্ধারে গভীর রাত পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। অত্যন্ত প্রতিকূল, ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যেও সুড়ঙ্গের ভেতর তল্লাশি ও উদ্ধার কাজ সর্বশক্তি দিয়ে অব্যাহত রাখা হয়েছে।

ন্যাশনাল হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন বা এনএইচপিসি-র (NHPC) অধীনে নির্মাণাধীন এই সুড়ঙ্গের দুর্ঘটনায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে এবং উদ্ধার কাজ আরও জোরদার করার উদ্দেশ্যে আসানসোলের ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড (ইসিএল) থেকে একটি দ্বিতীয় বিশেষ বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছেছে। গত বুধবার রাত ১০টা নাগাদ এই দ্বিতীয় দলটি নামচির দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছয় এবং অবিলম্বে উদ্ধার অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুটি বিশেষজ্ঞ দলের যৌথ উদ্যোগে মধ্যরাত পর্যন্ত মরণপণ উদ্ধারকার্য চালানো হয় এবং সুড়ঙ্গ থেকে আরও বেশ কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। নতুন করে দেহ উদ্ধারের পর এই দুর্ঘটনায় মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২২ জনে পৌঁছেছে। সুড়ঙ্গের ভেতরে আরও কোনও শ্রমিক জীবিত বা মৃত অবস্থায় আটকে রয়েছেন কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে এবং বাকিদের দ্রুত উদ্ধার করতে বিশেষ দলগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এবং নিখুঁত পারস্পরিক সমন্বয় রেখে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সমগ্র পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে সিকিম রাজ্য সরকার এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন।

ইটিভি ভারতের হাতে আসা সিকিম সরকার প্রদত্ত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রকৃত ও নেপথ্য কারণ অনুসন্ধান করতে সিকিম সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতর একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গত ২২ জুলাই সিকিমের মুখ্যসচিব আর. তেলং-এর স্বাক্ষর সম্বলিত সরকারি নির্দেশনামা প্রকাশ করা হয়। রাজ্য পুলিশের আইনশৃঙ্খলা বিভাগের আইজিপি তাশি ওয়াংইয়ালকে প্রধান করে চার সদস্যের এই হাই লেভেল কমিটি তৈরি করা হয়েছে। এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন খনি ও ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রধান নির্দেশক ফিগু শেরিং ভুটিয়া, একই বিভাগের অতিরিক্ত নির্দেশক কেশর লুইটেল এবং সদস্য সচিব হিসেবে সিকিম পুলিশের সিআইডি বিভাগের ডিআইজি তেনজিং লোডেন লেপচা।

উল্লেখ্য, গত ২০ জুলাই তিস্তা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের এই সুড়ঙ্গে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও বিষাক্ত মিথেন গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছিল। সেই দুর্ঘটনার বিস্তারিত কারণ অনুসন্ধানের পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সদ্য গঠিত এই কমিটিকে। কমিটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখবে যে এই বিস্ফোরণটি প্রাকৃতিকভাবে মিথেন বা অন্য কোনও বিষাক্ত গ্যাসের পকেট তৈরি হওয়ার কারণে হয়েছিল কি না, নাকি ভারী যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে যাওয়ার কারণে কিংবা অন্য কোনো মানবীয় ত্রুটির জেরে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।

পাশাপাশি, ১৯৫২ সালের খনি আইন (Mines Act, 1952), আন্তর্জাতিক টানেল সেফটি গাইডলাইন এবং ২০০৮ সালের বিস্ফোরক বিধি অনুযায়ী সমস্ত পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বিধি ও প্রমিত পরিচালনা পদ্ধতি বা এসওপি (SOP) যথাযথভাবে মেনে চলা হয়েছিল কি না, তাও কঠোরভাবে তদন্ত করে দেখা হবে। বিশেষ করে সুড়ঙ্গের ভেতর পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল ব্যবস্থা (Ventilation System), গ্যাস সনাক্তকরণ সেন্সর ও জরুরি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঠিক কার্যকারিতা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশের তারিখ থেকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটিকে তাদের বিস্তারিত রিপোর্ট ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসন নিহতদের পরিবার ও দুর্ঘটনাকবলিত শ্রমিকদের সমস্ত রকমের আইনি ও মানবিক সহায়তা প্রদান করছে।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty