সৌদি আরবের ঘুম উড়িয়ে দিল হুতিরা! লোহিত সাগরে তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করার ঐতিহাসিক ঘোষণা

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের রণকৌশলে ফের এক চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের তেहरান থেকে খামেনেইয়ের জানাজা সেরে ইয়েমেনে ফেরার পথে হুতি কর্মকর্তাদের বিমানে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংঘাত এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। তদন্তের পর হুতিরা নিশ্চিত হয় যে এই হামলার পেছনে সরাসরি সৌদি আরবের হাত রয়েছে, যার প্রতিশোধ হিসেবে হুতি নেতৃত্ব এবার সৌদির বাণিজ্য ও তেল রপ্তানির ওপর কঠোর অর্থনৈতিক আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি হুতি সেনার মুখপাত্র ইয়া ساری এক ঘোষণায় জানিয়েছেন যে তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা বা ‘মেরিটাইম এমবার্গো’ (Maritime Embargo) আরোপ করতে চলেছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো লোহিত সাগর ও আদিনের উপসাগরকে সংযোগকারী অত্যন্ত কৌশলগত ও সংবেদনশীল ‘বাব আল-মंदेব’ জলডमरুমধ্য কার্যত অবরুদ্ধ করা এবং সৌদি বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াত চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। হরমুজ প্রণালীর মতো এই জলপথটি বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ১৫ শতাংশ সমুদ্র বাণিজ্য পরিচালিত হয়ে থাকে। বর্তমানে হুতিরা শুধুমাত্র সৌদি আরবের পতাকাবাহী বা তাদের উদ্দেশ্যে যাওয়া জাহাজগুলোকে টার্গেট করার ঘোষণা দিলেও, এর বহুমুখী প্রভাব সরাসরি পুরো বিশ্ব অর্থনীতির ওপর পড়তে বাধ্য।

ইরানের সঙ্গে চলা দীর্ঘ সংঘাতে পারস্য উপসাগরের ‘হরমুজ প্রণালী’তে যাতায়াত চরমভাবে বিঘ্নিত হওয়ার পর থেকেই সৌদি আরব তাদের মোট উৎপাদিত কাঁচা তেলের রপ্তানি একটি বড় অংশ লোহিত সাগরের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বর্তমানে সৌদির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল জায়ান্ট ‘সৌদি আরামকো’-র উৎপাদিত মোট তেলের প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি অংশ দেশের অভ্যন্তরে ৭৪৬ মাইল দীর্ঘ ‘ইস্ট-वेस्ट পাইপলাইন’-এর মাধ্যমে দেশটির প্রধান রপ্তানি হাব ‘ইয়ানবু’ (Yanbu)-তে নিয়ে যাওয়া হয়। এই কৌশলগত পরিবর্তনের ফলেই ইয়ানবু বন্দরটি সৌদি আরবের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সাম্প্রতিক সামুদ্রিক তথ্য অনুযায়ী, এই বন্দর থেকে দৈনিক তেল রপ্তানির পরিমাণ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রেকর্ড গড়ে প্রায় ৪ মিলিয়ন ব্যারেলে গিয়ে ঠেকেছে। ইউরোপে যাওয়ার জন্য সৌদি ট্যাংকারগুলো উত্তর দিকে সুয়েজ খালের পথ ধরলেও, এশিয়ান বাজারমুখী জাহাজগুলোর জন্য দক্ষিণের ‘বাব আল-মंदेব’ প্রণালী ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। এমতাবস্থায়, হুতিদের এই চরম অবরোধের হুমকি সৌদি আরবের তেল বাণিজ্যকে পঙ্গু করে দিতে পারে এবং এর জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ অন্তত ৭ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বাব আল-মंदेব সামুদ্রিক পথটির গুরুত্ব আজকের নয়; প্রায় ৩০০০ বছর আগে প্রাচীন মিশর, আরব, ভারত ও আফ্রিকার মধ্যে মসলা ও সুগন্ধী বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম ছিল এই জলপথ। পরবর্তীতে ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হওয়ার পর এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাওয়ায় এই প্রণালীর বাণিজ্যিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। বর্তমান যুগেও এই পথ দিয়ে প্রতি বছর ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য পরিবাহিত হয়। এই সংকটের অপর একটি বড় দিক হলো, হুতিদের মোকাবিলা করতে গিয়ে একা সৌদি আরবের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বেশ কঠিন হবে। তাছাড়া, অতীতে হরমুজ প্রণালী খোলার মার্কিন অভিযানে সৌদি আরব শেষ মুহূর্তে আমেরিকার বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে রিয়াদের কূটনৈতিক সম্পর্কে একধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। ফলে সংকটজনক এই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে সৌদি আরবকে সরাসরি রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে তীব্র সংশয় ও জল্পনা অব্যাহত রয়েছে।