আধার কার্ড কি তবে সম্পত্তির মালিকানার প্রমাণ? কলকাতা হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে শোরগোল দেশজুড়ে!

আধার কার্ডকে এখন নিছক একটি সাধারণ পরিচয়পত্র কিংবা নতুন মোবাইল সিম কেনার কাগজ মনে করার দিন আর নেই। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী রায়ে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, আধার কার্ড কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তিতে স্থায়ী মালিকানা বা দখলের চূড়ান্ত আইনি প্রমাণ না হলেও, প্রথম নজরে ওই নির্দিষ্ট স্থানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বসবাস করার জোরালো প্রমাণ হিসেবে অবশ্যই গণ্য হতে পারে। আদালতের এই স্পষ্ট বার্তার পরেই প্রশাসন কর্তৃক হঠাৎ করে বিনা নোটিশে সাধারণ মানুষের বাড়িঘর ভাঙা এবং বেআইনিভাবে জবরদখল হঠানোর স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপের ওপর বড় ধরনের আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই রায়ের পর থেকেই জাতীয় স্তরে আধার কার্ডের আসল কার্যকারিতা ও আইনি গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে জোরদার আলোচনা শুরু হয়েছে। চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ঠিক কী নির্দেশ দিয়েছে আদালত এবং দৈনন্দিন জীবনে আধার কার্ডের আসল ভূমিকা ঠিক কতটা বিস্তৃত।
মূল ঘটনাটি ঘটেছে কলকাতার গার্ডেনরিচ এলাকার ব্রুক লেন অঞ্চলে, যেখানে ৫২ জন স্থানীয় বাসিন্দা আদালতের দ্বারস্থ হয়ে দাবি করেছিলেন যে তাঁরা দীর্ঘকাল ধরে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সেখানে বসবাস করে আসছেন। এর সপক্ষে তাঁরা নিজেদের আধার কার্ড, ভোটার আইডি কার্ড এবং গ্যাস সংযোগের বৈধ বিলের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র আদালতে পেশ করেন। কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ মামলাটির শুনানি শেষে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, এ ধরনের প্রাথমিক প্রমাণপত্রগুলো পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। অতএব, আইন অনুযায়ী প্রশাসন কোনোভাবেই রাতারাতি বা বিনা নোটিশে বুলডোজার চালাতে পারে না। ‘পাবলিক প্রিমাইসেস অ্যাক্ট, ১৯৭০’-এর সুনির্দিষ্ট বিধান মেনে আগে নোটিশ দিতে হবে, বাসিন্দাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে এবং যথাযথ আইনি শুনানি সম্পন্ন করার পরেই কেবল পরবর্তী পদক্ষেপ করা সম্ভব।
ভারতের সামগ্রিক নাগরিক জীবনে আধার কার্ড বর্তমানে সর্বাধিক ব্যবহৃত ও সর্বজনগ্রাহ্য একটি পরিচয়পত্র। এটি একই সঙ্গে ব্যক্তির পরিচয় ও বর্তমান ঠিকানার নিখুঁত প্রমাণ হিসেবে দেশের সর্বত্র সমাদৃত। নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, পাসপোর্ট তৈরি করা, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া কিংবা ভোটার কার্ডের মতো বহু অতি জরুরি সরকারি ও বেসরকারি কাজে আধারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এর ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আধার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দর থেকে শুরু করে ট্রেন ভ্রমণ—সর্বত্রই নির্ভরযোগ্য আইডি প্রুফ হিসেবে আধার কার্ডের ব্যবহার বাধ্যতামূলক ও অত্যন্ত জনপ্রিয়।
সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর সুবিধা সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আধার কার্ড এক প্রকার চাবিকাঠির কাজ করে। রান্নার গ্যাসের ভর্তুকি, বার্ধক্য বা বিধবা পেনশন, ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন স্কলারশিপ এবং অন্যান্য ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার বা ডিবিটি প্রকল্পের সমস্ত অর্থ নিখুঁতভাবে আধার লিঙ্ক করা ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোর মাধ্যমেই গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যায়। এর বাইরেও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট সচল রাখা এবং ই-কেওয়াইসি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে আধার কার্ড অপরিহার্য। এমনকি শুধুমাত্র আধার নম্বর এবং বায়োমেট্রিক অথেন্টিকেশনের মাধ্যমে টাকা তোলা, জমা দেওয়া এবং ফান্ড ট্রান্সফার করার মতো আর্থিক সুবিধাও আজ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।
ট্যাক্স ফাইলিং এবং ডিজিটাল পরিষেবার ক্ষেত্রেও আধারের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। স্থায়ী অ্যাকাউন্ট নম্বর বা প্যান কার্ডের সঙ্গে আধার কার্ড লিঙ্ক করা এবং সময়মতো ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন ফাইল করার জন্য আধার বাধ্যতামূলক। আধারের ঝটপট ই-কেওয়াইসি প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব কম সময়েই নতুন প্যান কার্ড বানিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। এ ছাড়াও, ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে ডিজিলর্ডারে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সুরক্ষিত রাখা এবং ডিজিটাল সিগনেচারের মাধ্যমে অনলাইন ফর্ম বা কাগজপত্রে স্বাক্ষর করার মতো আধুনিক ডিজিটাল পরিষেবাগুলোতেও আধার কার্ডের মাধ্যমে পরিচয় যাচাইকরণ বা অথেন্টিকেশন বাধ্যতামূলকভাবে করা হয়ে থাকে।