“সামুদ্রিক বাণিজ্যে বড় সংকট! খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে ম্যানিলা থেকে সতর্কবার্তা এস জয়শঙ্করের”

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি শক্তি, খাদ্য এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে আর কোনোভাবেই সুনিশ্চিত বা নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া যায় না। ফিলিপিন্সের ম্যানিলায় আয়োজিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘আসিয়ান পোস্ট-মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্স উইথ ইন্ডিয়া ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ঠিক এই কঠোর সতর্কবার্তাই শোনালেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এদিন তিনি ভারত ও আসিয়ান (ASEAN) দেশগুলির যৌথ ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সহযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলপথ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বর্তমান উদ্বেগের দিকগুলিও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন।

ম্যানিলার এই আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানান যে, বর্তমান বিশ্বে শক্তি, খাদ্য এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলি ক্রমাগত অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। যেহেতু ভারত এবং আসিয়ান গোষ্ঠীভুক্ত প্রতিটি দেশই সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর অত্যন্ত গভীরভাবে নির্ভরশীল, তাই আন্তর্জাতিক জলপথে সামান্য অস্থিরতাও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। এই জটিল পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক শান্তি ও বাণিজ্য অটুট রাখতে আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৬ সালটি হল ‘আসিয়ান-ভারত সামুদ্রিক সহযোগিতা বর্ষ’। এই বিশেষ বর্ষ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে একটি অধিকতর স্থিতিশীল, নিরাপদ এবং প্রগতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে আমাদের যৌথভাবে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। ভারত এবং আসিয়ান উভয়পক্ষই নিজেদের আঞ্চলিক ভবিষ্যৎ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। বর্তমানে ভারত-আসিয়ান দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মূল এজেন্ডার মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মেধা ও প্রতিভা বিনিময়, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), পরিবেশবান্ধব গ্রিন উদ্যোগ এবং শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একমাত্র গভীর ও সুসংহত সহযোগিতার মাধ্যমেই বর্তমান বৈশ্বিক ঝুঁকিগুলি কমানো এবং সাপ্লাই চেনে বৈচিত্র্য আনা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।

উল্লেখ্য, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য ঠিক এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন ফিলিপিন্স আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের জন্য আসিয়ান (ASEAN)-এর ঘূর্ণায়মান সভাপতিত্ব গ্রহণ করেছে। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্যই বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বর্তমানে ফিলিপিন্সের ম্যানিলা সফরে রয়েছেন। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ২২ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত চলা এই সফরে জয়শঙ্কর আসিয়ান-ভারত বার্ষিক বৈঠক ছাড়াও ইস্ট এশিয়া সামিট (EAS) এবং আসিয়ান রিজিওনাল ফোরাম (ARF)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক বৈঠকে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলির মন্ত্রীদের সঙ্গে এই বৈঠকগুলির পাশাপাশি তাঁর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কোয়াড (Quad) বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকেও যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি, আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করতে বিভিন্ন দেশের সমকক্ষ মন্ত্রীদের সঙ্গে একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও অংশ নেবেন তিনি।

চলতি বছরে ফিলিপিন্স যখন আসিয়ান-এর সভাপতিত্ব গ্রহণ করেছে, তখন তাদের নির্ধারিত মূল থিম বা প্রতিপাদ্য বিষয় হলো—”Navigating Our Future, Together” (একসঙ্গে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিচালনা)। এই থিমের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আঞ্চলিক শান্তি ও সুদৃঢ় নিরাপত্তা রক্ষা, অর্থনৈতিক সংহতি জোরদার করা, ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন সুনিশ্চিত করা। বর্তমান বিশ্বজুড়ে যখন অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, তখন আসিয়ান গোষ্ঠী তাদের সদস্য দেশগুলির পাশাপাশি ভারতের মতো বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী বহিরাগত অংশীদারদের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা বহুগুণ বাড়িয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা মজবুত করতে চাইছে। ঠিক এমন এক সংকটময় ও সম্ভাবনাময় সন্ধিক্ষণে ফিলিপিন্সের এই নতুন নেতৃত্ব গ্রহণ এবং জয়শঙ্করের এই জোরালো বার্তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অত্যন্ত দূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।