নির্বাচন কমিশনে বিরাট বোমা ফাটালেন ঋতব্রত! দলীয় স্বীকৃতি ও হাজার কোটির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কব্জা করার হুঙ্কার

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা এবং বিদ্রোহী তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার এক সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্য রাজনীতিতে রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন যে, তাঁদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আনুষ্ঠানিক আইনি স্বীকৃতির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে সমস্ত প্রয়োজনীয় ও পুঙ্খানুপুঙ্খ নথি আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত জোরালো আশাপ্রকাশ করে বলেছেন যে, ভারতের নির্বাচন কমিশন তাঁদের এই দাবি যথাযথভাবে বিবেচনা করে স্বীকৃতি প্রদান করবে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসের সুরেই দাবি করেছেন যে, দলের মূল সাংগঠনিক কাঠামো এবং সিংহভাগ নির্বাচিত প্রতিনিধি এই মুহূর্তে তাঁর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর সঙ্গেই দৃঢ়ভাবে যুক্ত রয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) কর্তৃক তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা এবং সেই জব্দ করা বিপুল পরিমাণ তহবিলের ওপর নিজেদের আইনি ও নৈতিক দাবি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ঋতব্রত রাজ্য নেতৃত্বকে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, শুধুমাত্র ওই ফ্রিজ করা অ্যাকাউন্টগুলির সুদ বাবদই বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ জমা হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ টাকার প্রকৃত প্রাপক কে হবেন, তা নিয়ে তিনি জোরদার সওয়াল করেছেন। অত্যন্ত ঝাঁঝালো সুরে ঋতব্রত বলেন, “আমরা শহিদ পরিবারগুলিকে সামান্য ক্ষতিপূরণ দিচ্ছি বলে কোনো ঔদ্ধত্য প্রকাশ করছি না। আমাদের মূল বক্তব্য হলো, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার ফলে যে বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি সুদ আসছে, সেই বিশাল অঙ্কের সুদের টাকা কাদের পকেটে যাচ্ছে? এই টাকা কি স্রেফ পিসি ও ভাইপোর ব্যক্তিগত পকেটে ভরার জন্য, নাকি দলের প্রকৃত নিচুতলার কর্মীদের অধিকার রক্ষায় তাঁদের কাছে পৌঁছানোর জন্য?”

সাংবাদিক বৈঠকে নিজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পদক্ষেপের রূপরেখা স্পষ্ট করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় আরও জানান যে, নির্বাচন কমিশনের কাছে সমস্ত আইনি দলিলপত্র জমা দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যদি আরও কোনো নির্দিষ্ট নথির প্রয়োজন হয়, তবে তা দ্রুত সরবরাহ করা হবে। তিনি বারবার এই কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, তৃণমূলের আদি ও আসল সাংগঠনিক শক্তি এবং জনপ্রতিনিধিরা তাঁর পাশেই রয়েছেন। যদি ভবিষ্যতে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তাঁরা দলীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলির পরিচালনার দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ হাতে পান, তবে দলের সমস্ত তহবিলের ব্যবহার অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অরূপ রায়ের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় কার্যকরী কমিটি (NWC) এবং সামগ্রিক দলীয় কাঠামো প্রসঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন যে, অ্যাকাউন্ট পরিচালনার অধিকার পেলে প্রতি তিন মাস অন্তর দলের সমস্ত আয়ের ও ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি তিনি ঐতিহাসিক ঘোষণা করে বলেন, “আমাদের প্রথম এবং প্রধান সিদ্ধান্ত হবে একুশে জুলাইয়ের শহিদ পরিবারগুলির হাতে দলের পক্ষ থেকে প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া।”

এদিকে, বিদ্রোহী তৃণমূল গোষ্ঠীর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক ও জল্পনা চলছে, ঠিক সেই সময়েই জাতীয় রাজনীতিতেও এর ঢেউ আছড়ে পড়েছে। গত রবিবার সংসদের আসন্ন বাদল অধিবেশনের প্রাক্কালে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের ডাকা সর্বদলীয় বৈঠক থেকে দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলি প্রতীকী ওয়াকআউট করে বেরিয়ে আসে। ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই (NCPI)-কে এই বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর তীব্র প্রতিবাদেই মূলত এই পদক্ষেপ করা হয়েছিল। বিরোধী দলগুলির কড়া অভিযোগ ছিল যে, বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের এনসিপিআই দলের সঙ্গে সংযুক্তিকরণ প্রক্রিয়াটি তখনও পর্যন্ত লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়নি, তা সত্ত্বেও এই ধরনের আমন্ত্রণ সংসদীয় রীতিনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। যদিও পরবর্তী সময়ে বিরোধী নেতারা সেই বৈঠকে পুনরায় যোগ দেন এবং তাঁদের সেই ওয়াকআউটের ঘটনাকে শুধুমাত্র একটি প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবেই ব্যাখ্যা করেন। সোমবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদের বাদল অধিবেশন শুরু হয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে লোকসভার স্পিকার তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসা বিদ্রোহী ২০ জন সাংসদের জন্য সংসদ ভবনে আলাদা বসার বিশেষ ব্যবস্থা অনুমোদন করেছেন। তবে দলীয় সংযুক্তিকরণ ঘিরে রাজনৈতিক জল যে আরও বহু দূর গড়াবে, তা বলাই বাহুল্য।