ভিডিও দেখানোর জো নেই! নিট আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি ‘অত্যাচার’ মামলায় কড়া বার্তা সুপ্রিম কোর্টের!

দিল্লিতে নিট (NEET) ও এনটিএ (NTA) সংস্কার এবং প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের ওপর দিল্লি পুলিশের চরম লাঠিচার্জ ও ‘অত্যাচার’ এর ঘটনায় এখনই মাথা গলাতে নারাজ দেশের সর্বোচ্চ আদালত। গত ২০ জুলাই সংসদের বাদল অধিবেশਨের প্রথম দিনে ‘চলো সংসদ’ অভিযান ডেকেছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)। সেখানে পুলিশি তাণ্ডবের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টকে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা গ্রহণ ও জরুরি ভিত্তিতে শুনানির আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু বুধবার স্পষ্ট ভাষায় সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। আদালত কক্ষে প্রধান বিচারপতি সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, ভিডিও জমা দিয়ে শীর্ষ আদালতের মূল্যবান সময় যেন নষ্ট করা না হয়। বুধবার সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহানার সমন্বয়ে গঠিত তিন বিচারপতির বেঞ্চের সামনে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। আবেদনকারী শীর্ষ আদালতের কাছে আর্জি জানান, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং এনটিএ-র আমূল সংস্কারের দাবিতে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী যখন সংসদের দিকে এগোচ্ছিলেন, তখন দিল্লি পুলিশ তাঁদের ওপর মারাত্মক হামলা চালায়। তাই শীর্ষ আদালতের উচিত এই বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হস্তক্ষেপ করা।
তবে মামলাকারীর এই আর্জি শোনামাত্রই প্রধান বিচারপতি কড়া সুর চড়িয়ে বলেন, “আমাদের সময় নষ্ট করবেন না, আর নিজের সময়ও নষ্ট করুন না। আইনি যে পথ ও নিয়ম রয়েছে, তা অনুসরণ করুন।” তবুও পিছু না হটে আবেদনকারী আইনজীবী আদালতকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এই বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশের লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ। নিট পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এনটিএ-র গাফিলতি জড়িয়ে রয়েছে এর পেছনে। এমনকি পুলিশ যে সম্পূর্ণ নিরপরাধ ও নিরস্ত্র পড়ুয়াদের ওপর নৃশংসভাবে লাঠিচার্জ করেছে, তার প্রামাণ্য ভিডিও ফুটেজ আদালতের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি। কিন্তু বেঞ্চ সেই প্রস্তাব এক কথায় নাকচ করে দেয়। পুলিশি অত্যাচারের ভিডিও দেখতে বা জমা নিতে সোজাসুজি অস্বীকার করে বেঞ্চ মন্তব্য করে, “আমরা কোনও ভিডিও দেখতে আগ্রহী নই। ভিডিও দেখার মতো সময় আমাদের হাতে নেই।” এরপরই তিন বিচারপতির বেঞ্চ সংক্ষেপে “ধন্যবাদ” জানিয়ে জরুরি শুনানির আর্জি বাতিল করে দেয়। উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া অবস্থানের ঠিক এক দিন আগেই দিল্লি হাইকোর্টও একই রকম অবস্থান নিয়েছিল। সেখানেও পুলিশি তাণ্ডবের বিরুদ্ধে জরুরি শুনানির আবেদন জানানো হলে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, আদালতকে এসবের মধ্যে যেন টেনে না আনা হয়।
প্রসঙ্গত, গত সোমবার ২০ জুলাই সংসদের বাদল অধিবেশন শুরুর দিনে ‘চলো সংসদ’ অভিযানের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পড়ুয়া যন্তর মন্তর থেকে সংসদের দিকে মিছিল করে এগোতে থাকেন। তাঁদের দাবি ছিল একটাই, একের পর এক প্রশ্ন ফাঁসের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, পরীক্ষার্থীদের আত্মহত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং এনটিএ-র সংস্কার। মিছিলটি সেন্ট্রাল দিল্লির দিকে এগোতেই দিল্লি পুলিশ ব্যারিকেড গড়ে তা আটকানোর চেষ্টা করে। বিকেলের দিকে ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের একটি দল পুলিশের সেই ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের ভবনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এর পরপরই উন্মুক্ত রাস্তায় তৈরি হয় রণক্ষেত্র। ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তারক্ষীরা কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায় এবং ব্যাপক লাঠিচার্জ শুরু করে। সামাজিক মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশকর্মীরা নিরস্ত্র পড়ুয়াদের নির্মমভাবে পেটাচ্ছেন। হাসপাতাল সূত্রের খবর, পুলিশের এই বলপ্রয়োগের ঘটনার পর প্রায় একশো জনেরও বেশি আন্দোলনকারী জখম অবস্থায় চিকিৎসা করাতে আসেন। এখনও পর্যন্ত রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন ২২ বছর বয়সি এক তরুণী আন্দোলনকারী। পড়ুয়াদের ওপর এই পুলিশি অভিযানের পর জাতীয় রাজনীতি মারাত্মক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিরোধীরা একযোগে সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেছে। সুপ্রিম কোর্ট জরুরি ভিত্তিতে আবেদন শুনতে রাজি না হওয়ায় এখন পুরো বিষয়টি স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগোবে। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংসদ থেকে রাজপথ—কেন্দ্রের মোদী সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।