আত্মনির্ভর ভারতের মুকুটে নতুন পালক! দেশেই তৈরি হলো শক্তিশালী ‘যন্তুর’ ৪.৫ কেএন টার্বোফ্যান ইঞ্জিন!

প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ (অ্যারোস্পেস) প্রযুক্তিতে ভারতকে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভর ও সার্বভৌম করে তোলার লক্ষ্যে আরও একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। দেশের তরুণ মেধাকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় ডিপটেক স্টার্টআপ ‘পাণিনিয়ান ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড’ তাদের অত্যন্ত শক্তিশালী ও সর্বাধুনিক স্বদেশি ‘যন্ত্র’ (Yantur) ৪.৫ কিলোনিউটন (kN) টার্বোফ্যান ইঞ্জিন বিশ্বের সামনে সফলভাবে উন্মোচন করেছে। সম্পূর্ণ বেসরকারি খাতের উদ্যোগে তৈরি এই দেশি ইঞ্জিন আগামী দিনে ভারতের ভবিষ্যৎ দীর্ঘ-পাল্লার ড্রোন, কমব্যাট ইউএভি (CCAV) এবং অত্যাধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য নিজস্ব ও নির্ভরযোগ্য প্রপালশন প্রযুক্তি সরবরাহ করবে। এর ফলে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই প্রযুক্তিগুলোর জন্য ভারতকে আর কোনোদিন বিদেশি সরবরাহকারী রাষ্ট্র বা অন্য দেশের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না।
এই নতুন দেশি টার্বোফ্যান ইঞ্জিনের সবচেয়ে বড় এবং তাক লাগানো প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সম্পূর্ণ স্কেলযোগ্য (Scalable)। অর্থাৎ ভবিষ্যতের অপারেশনাল প্রয়োজন এবং কৌশলগত চাহিদা অনুযায়ী এর শক্তি ও ক্ষমতা অনায়াসেই ১২.৫ কিলোনিউটন (kN) পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এই যুগান্তকারী উদ্ভাবন প্রমাণ করে যে ভারত এখন কেবল প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানিকারক দেশ নয়, বরং বিশ্বমানের সামরিক প্রযুক্তি প্রস্তুতকারক দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে। এই ইঞ্জিনটি মূলত বিশেষভাবে পাণিনিয়ানের নিজস্ব ‘স্বায়ত্ত এল১’ (Svayatt L1) প্ল্যাটফর্মকে চালিত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এই অভিনব প্ল্যাটফর্মটি বর্তমানে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের উচ্চাভিলাষী ‘মেক-I’ (Make-I) কর্মসূচির অধীনে লং-রেঞ্জ ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইল (LRLACM)-এর সমস্ত কৌশলগত ও অপারেশনাল চাহিদা পূরণ করার জন্য দ্রুত গতিতে তৈরি করা হচ্ছে।
কোম্পানির শীর্ষকর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই অত্যন্ত জটিল ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের ধারণাগত (Conceptual) এবং বিস্তারিত নকশা (Detailed Design) পর্যায় অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে এই ইঞ্জিনটি সাব-সিস্টেম টেস্টিং, কঠোর যাচাইকরণ (Verification) এবং সম্পূর্ণ ইঞ্জিন সার্টিফিকেশনের চূড়ান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ‘যন্তুর’ এবং ‘স্বায়ত্ত L1’ প্রকল্পের সামগ্রিক বিকাশের আওতায় কোম্পানিটি ইতিমধ্যেই মোট ৫টি নতুন পেটেন্টের জন্য আনুষ্ঠানিক দাবি দাখিল করেছে। এই ইঞ্জিনটিতে একাধিক অত্যাধুনিক ও বিশ্বমানের প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে অভিনব ইঞ্জিন ফ্যামিলি আর্কিটেকচার, সর্বাধুনিক কম্প্রেসর প্রযুক্তি, অত্যন্ত উন্নত কমবাস্টর (Combustor) ও ডিফিউজার-নোজল ডিজাইন, এবং ডিজিটাল-ট্যুইন (Digital Twin) ভিত্তিক রিয়েল-টাইম হেলথ মনিটরিং ও অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং প্রযুক্তি।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দেশি ইঞ্জিনের আত্মপ্রকাশ ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। সিইএমআইএলএসি (CEMILAC)-এর প্রাক্তন গ্রুপ ডিরেক্টর জি. গৌড়া, যিনি অতীতে তেজস (LCA) যুদ্ধবিমানের বিশ্বখ্যাত GE404 এবং GE414 ইঞ্জিন কর্মসূচির পর্যালোচনা করেছেন, তিনি এই অভাবনীয় উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে এটি ভারতের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত স্বর্ণালী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, যা ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন বা ডিআরডিও (DRDO)-র বিজ্ঞানীরা অতীতে যে শক্ত ভিত গড়ে তুলেছিলেন, তাকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারতের এই অভাবনীয় প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে বিশ্বমঞ্চে দেশের কৌশলগত অবস্থান আরও অনেক বেশি শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।