৪২ লক্ষ কোটির ব্যাঙ্ক জালিয়াতি! উদ্ধার মাত্র ৪.৫%! মোদী জমানায় দেশের অর্থনীতি নিয়ে সংসদে বিস্ফোরক তৃণমূল সাংসদ!

চলতি সংসদের বাজেট অধিবেশনে দেশের আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার হাল নিয়ে কেন্দ্রীয় মোদী সরকারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও বিস্ফোরক অবস্থান নিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ সাংসদ সাগরিকা ঘোষ। সংসদের উচ্চকক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন দেশের অর্থনৈতিক নীতি এবং ক্রমবর্ধমান আর্থিক কেলেঙ্কারী নিয়ে। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্যের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তৃণমূল সাংসদ দাবি করেন যে, বর্তমান মোদী সরকারের আমলে গত পাঁচ বছরের দীর্ঘ সময়সীমায় দেশে মোট ব্যাঙ্ক জালিয়াতির অবিশ্বাস্য পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৪২ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিপুল পরিমাণ জালিয়াতির অর্থের মধ্যে নথিপত্র ঘেঁটে এখনও পর্যন্ত মাত্র ৬,৩৮৯ কোটি টাকা সফলভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পরিসংখ্যানের হিসেবে যা মোট জালিয়াতির অর্থের মাত্র ৪.৫ শতাংশ মাত্র।

অর্থাৎ, সহজ কথায় বলতে গেলে, ব্যাংক জালিয়াতির ক্ষেত্রে প্রতি একশো টাকার মধ্যে প্রায় ৯৫ টাকাই আজ পর্যন্ত অন্ধকারে হারিয়ে গেছে এবং সেই সমস্ত অর্থের কোনো হদিশ মেলেনি। এই পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই বহু গভীর প্রশ্ন ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। সাগরিকা ঘোষ জোরালো ভাষায় জানতে চান যে, সাধারণ মানুষের রক্তের উপার্জিত এত বিশাল অঙ্কের টাকা ঠিক কোথায় উধাও হয়ে গেল এবং এই বিশাল কেলেঙ্কারির নেপথ্যেই বা আসল কারা জড়িত রয়েছে? তিনি উদাহরণ টেনে বলেন যে, যখন দেশের একজন সাধারণ দরিদ্র কৃষক কিংবা কোনো ছোট দোকানদার বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যাংকের সামান্য ঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, তখন তৎক্ষণাৎ ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাদের বাড়িতে দ্রুত নোটিশ পাঠানো হয়, ঋণের টাকা মেটানোর জন্য চরম চাপ সৃষ্টি করা হয়, তাদের আইনি নোটিশের মাধ্যমে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ভয় দেখানো হয় এবং তাদের মূল্যবান ক্রেডিট স্কোর চিরতরে নষ্ট করে দেওয়া হয়।

কিন্তু এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় যখন হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক জালিয়াতি হয়। সেই সমস্ত হাই-প্রোফাইল বড় অঙ্কের কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং তদন্তের প্রক্রিয়া অত্যন্ত মন্থর গতিতে চলতে থাকে। ব্যাংকের ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘুরতেই বছরের পর বছর কেটে যায়, আর ব্যাংক জালিয়াতির সেই সমস্ত বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধারের গতি কচ্ছপের থেকেও ধীর হয়ে পড়ে। এই দ্বিমুখী নীতি এবং বৈষম্যমূলক আচরণ সাধারণ নাগরিকদের মনে সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বালছে। সংসদে উত্থাপিত বিভিন্ন তথ্য ও রিপোর্ট অনুযায়ী স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, এই বিপুল পরিমাণ ব্যাংকিং জালিয়াতির সিংহভাগ ঘটনাই বড় বড় কর্পোরেট ঋণখেলাপিদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, শত শত কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে তুলে নিয়ে সেই অর্থ বিদেশে পাচার করে দেওয়া হয়েছে কিংবা জালিয়াতি ধরা পড়ার আগেই নিজেদের সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি অন্য কোনো বেনামী ব্যক্তির নামে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয় যে তারা অর্থনৈতিক অপরাধীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, কিন্তু বাস্তবে ব্যাংক জালিয়াতির অর্থ উদ্ধারের এই করুণ চিত্র সেই সমস্ত দাবির সত্যতা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দেয়। কেন বড় বড় কর্পোরেট ও ভিআইপি ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান এবং দ্রুত অগ্রগতি দেখা যায় না? দেশের সাধারণ মানুষের মনে আজ এই একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে, এই ভিআইপি জালিয়াতদের ঠিক কারা আড়াল করছে এবং তাদের পেছন থেকে কে বা কারা রক্ষা করে চলেছে? দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক জালিয়াতি শুধুমাত্র সরকারের বা ব্যাংকের কিছু আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমগ্র দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। যে বিপুল পরিমাণ টাকা অসাধু উপায়ে লুট হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে আর উদ্ধার করা সম্ভব হয় না, সেই অর্থ দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য নতুন করে ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হয় না।

এর ফলে দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি খাত এবং এমএসএমই (MSME) সেক্টরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে নতুন করে ঋণ পাওয়া চরমভাবে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অথচ আমাদের দেশের অর্থনীতিতে এই ছোট ছোট উদ্যোগ এবং খাতগুলোই সবচেয়ে বড় স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। একদিকে সাধারণ ও সৎ নাগরিকদের ওপর নানাভাবে ব্যাংকের অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করা, আর অন্যদিকে বিশাল আর্থিক জালিয়াতির ঘটনায় অপরাধীদের প্রতি নমনীয় ও দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ মনোভাব—কেন এই দ্বৈত নীতি বজায় রাখা হচ্ছে? সরকারি তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায় যে, বিগত কয়েক বছরের মধ্যে পিএনবি (PNB), স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (SBI), কানাডা ব্যাংকসহ দেশের বিভিন্ন নামী রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকে একাধিক বড় বড় কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। নীরব মোদী, মেহুল চোকসি, ভূষণ স্টিল কিংবা এসএস গ্রুপের মতো কুখ্যাত জালিয়াতির ঘটনাগুলো আজও দেশের মানুষের স্মৃতিতে টাটকা রয়েছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে এই মামলার মূল অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশের মাটিতে পালিয়ে আরামদায়ক জীবন কাটাচ্ছেন, আর তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বা অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং জটিল আইনি লড়াইয়ের গ্যাঁড়াকলে আটকে রয়েছে। এদিকে দেশের সাধারণ ও সৎ ঋণগ্রহীতারা ব্যাংক ঋণের এবং নন-পারফর্মিং অ্যাসেট বা এনপিএ-র (NPA) লাগাতার চাপে সর্বস্বান্ত হয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।