একই গোত্রে বিয়ে করায় ফরমান! ১১ বছরের বর্জন গড়াল যাবজ্জীবনে, সমাজপতিদের নিদানে তোলপাড় মধ্যপ্রদেশ!

একদিকে যখন দেশ আধুনিকতা ও ডিজিটাল ভারতের পথে দ্রুত এগিয়ে চলেছে, অন্যদিকে ঠিক তখনই দেশের কিছু অঞ্চলে প্রাচীন সামাজিক গোঁড়ামি ও কড়া অনুশাসন মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর মারাত্মকভাবে চেপে বসছে। মধ্যপ্রদেশের বড়ওয়ানি জেলা থেকে ঠিক এমনই এক অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও অমানবিক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে, যা সমগ্র দেশে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। মধ্যপ্রদেশের বরওয়ানি জেলার রাজপুর তহসিলে একই গোত্রে প্রেম করে বিয়ে করার ‘অপরাধে’ এক নবদম্পতি এবং তাদের পুরো পরিবারকে সমাজ থেকে কঠোরভাবে বয়কট করার নিদান দিয়েছে স্থানীয় পঞ্চায়েত। এই অমানবিক ফতোয়ায় কেবল বর ও কনের পরিবারকেই সমাজছাড়া করা হয়নি, তাদের ওপর চাপানো হয়েছে বিরাট অঙ্কের আর্থিক জরিমানা। এখানেই শেষ নয়, ওই বিয়েতে উপস্থিত সমস্ত আত্মীয়-স্বজন ও বরযাত্রীদেরও ছাড় দেয়নি সমাজপতিরা, তাদের মাথাতেও চাপানো হয়েছে মোটা অঙ্কের আর্থিক দণ্ডের বোঝা। বর্তমানে এই চাঞ্চল্যকর ও নক্কারজনক মামলাটি গড়িয়েছে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চ পর্যন্ত।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, বরওয়ানির রাজপুর এলাকার বাসিন্দা হর্ষ লোনারে এবং নিকিতা দীর্ঘদিন ধরে একে অপরকে ভালোবাসতেন। পরবর্তীতে উভয় পরিবারের পূর্ণ সম্মতিক্রমে সমস্ত সামাজিক রীতি-নীতি ও আনন্দ-উৎসাবের মধ্য দিয়ে তাদের এই বিবাহ সম্পন্ন হয়। বর ও কনে পক্ষের পরিবারগুলোর সাফ দাবি, যদিও তাত্ত্বিকভাবে উভয়ের গোত্র এক ছিল, তবুও গত ১০ প্রজন্মের মধ্যে দুই পরিবারের রক্তে বা বৈবাহিক সম্পর্কে কোনো ধরনের সংযোগ ছিল না। সেই ঐতিহাসিক ও বংশলতিকাভিত্তিক সত্যতার ওপর ভিত্তি করেই পরিবারগুলোর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে এই বিয়েতে কোনো ধরনের সামাজিক বা আইনি বাধা থাকতে পারে না। শুধু তাই নয়, ভারতের প্রচলিত সংবিধান এবং দেশের বর্তমান আইন অনুযায়ীও এই ধরনের বিবাহ সম্পূর্ণভাবে বৈধ ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। কিন্তু স্থানীয় সমাজপতিদের প্রাচীন ও রক্ষণশীল মানসিকতা এই যুক্তির ধারেকাষ ঘেঁষেনি।
বিয়ের অনুষ্ঠান মিটতেই কুশওয়াহা সমাজের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও মাতব্বররা জরুরি পঞ্চায়েত ডেকে একতরফাভাবে এই মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত নেন যে, ওই নবদম্পতির উভয় পরিবারকে আগামী ১১ বছরের জন্য সমাজ থেকে সম্পূর্ণভাবে একঘরে বা বহিষ্কৃত করে রাখা হবে। একই সঙ্গে শাস্তি স্বরূপ দুই পরিবারের ওপর ৫১ হাজার টাকা করে মোট এক লক্ষ দুই হাজার টাকার ভারী আর্থিক জরিমানাও চাপানো হয়। তবে সমাজপতিদের জিঘাংসা এখানেই শান্ত হয়নি। পঞ্চায়েত আরও ফরমান জারি করে যে, ওই বিয়েতে যারা আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বা বরযাত্রী হিসেবে গিয়েছিলেন, তাদের প্রত্যেককে জরিমানার অংশ হিসেবে ২,১০০ টাকা করে জমা দিতে হবে। সামাজিক একঘরে হওয়ার চরম আতঙ্ক এবং সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অব্যাহত চাপের মুখে পড়ে অনেক সাধারণ মানুষ সেই অন্যায় জরিমানার টাকা মিটিয়ে দিতে বাধ্য হন।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় যখন বিয়ের কিছুদিন পর সমাজপতিদের পক্ষ থেকে ফের একটি বৈঠক ডাকা হয়। সেই বৈঠকে আগের সিদ্ধান্তকে আরও অনেক বেশি নির্মম ও কঠোর করে তোলা হয়। উভয় পরিবারের ১১ বছরের সামাজিক বহিষ্কারের মেয়াদ একলাফে বাড়িয়ে সরাসরি ‘আজীবন’ বা যাবজ্জীবন করে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, এর আগে বিয়েতে অংশ নেওয়া অতিথিদের ওপর যে ২,১০০ টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়েছিল, তা বাড়িয়ে সরাসরি ৫,১০০ টাকা করে দেওয়া হয়। এই ভয়াবহ ও অমানবিক সিদ্ধান্তের পর থেকে ওই পরিবারগুলোকে স্থানীয় সমস্ত সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত নানাভাবে মানসিক চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি এই অবিচারের বিরুদ্ধে যারা সামান্য প্রতিবাদের আওয়াজ তুলেছিলেন, সেই কুশওয়াহা সমাজের প্রাক্তন জেলা সাধারণ সম্পাদক নন্দরাম কুশওয়াহাকেও সমাজপতিরা রেয়াত করেননি এবং তাকে জোর করে ৬ বছরের জন্য তার পদ থেকে অপসারিত করা হয়।
নববধূ নিকিতার আক্ষেপ, আজ যখন গোটা দেশ জাতপাত ও সমস্ত ট্যাবু ভেঙে আন্তঃজাতি ও প্রেম বিবাহকে সচ্ছলভাবে স্বীকার করে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে, তখন দেশের আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ বৈধ একটি বিয়ে করার অপরাধে তাকে ও তার পরিবারকে পদে পদে মানসিক ও সামাজিক প্রতাড়নার শিকার হতে হচ্ছে। স্থানীয় স্তরে কোথাও কোনো ন্যায়বিচার বা সুরাহা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে সেই ভুক্তভোগী পরিবার আইনি লড়াইয়ের পথ বেছে নেয় এবং মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চের দারস্থ হয়। মামলার প্রাথমিক শুনানি গ্রহণ করে এবং ঘটনার তীব্রতা ও সংবেদনশীলতা বিচার করে মহামান্য আদালত সমাজের অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত নোটিশ জারি করেছে এবং রাজ্য সরকারের কাছে এই বিষয়ে বিস্তারিত জবাব তলব করেছে। একই সঙ্গে আদালত অন্তর্বর্তীকালীন কড়া নির্দেশিকা জারি করে জানিয়েছে যে, যদি ওই নবদম্পতির জীবনের ওপর সামান্যতম কোনো হুমকি বা প্রতাড়না আসে, তবে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে অবিলম্বে তাদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত কুশওয়াহা সমাজের বিভাগীয় সভাপতি রমেশচন্দ্র কুশওয়াহা সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলে সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, এই ধরনের কোনো আইনি নোটিশ তাঁরা এখনও হাতে পাননি। অফিশিয়ালি আদালতের নোটিশ হাতে পাওয়ার পরেই তাঁরা উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণসহ আদালতে নিজেদের বক্তব্য পেশ করবেন। বর্তমানে গোটা মামলাটি উচ্চ আদালতের বিচারাধীন রয়েছে এবং এর পরবর্তী শুনানির দিকে সারা দেশের নজর রয়েছে। তবে এই নক্কারজনক ঘটনাটি দেশের আধুনিক সংবিধান প্রদত্ত ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও অধিকারের সঙ্গে রক্ষণশীল সামাজিক অনুশাসনের চিরন্তন ও তীব্র সংঘাতের বাস্তব চিত্রটিকে আরও একবার সকলের সামনে খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।