ফলের রাজার অদ্ভুত নামের রহস্য! কেন ল্যাংড়া বা চৌসার মতো নাম পেলেন আমপ্রেমীদের প্রিয় ফলগুলো?

ফলের রাজা আম, আর সেই রাজার রাজত্বে যদি ল্যাংড়া কিংবা চৌসার মতো পদবীর প্রজা থাকে, তবে স্বাদের গল্প জমে উঠতে বাধ্য। গ্রীষ্মের তীব্র তাপে একফালি ঠান্ডা আমের রসাল কামড় যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দেয়। আজ ২২ জুলাই, জাতীয় আম দিবস। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, যে ফলের গন্ধে আর স্বাদে গোটা দুনিয়া মাতোয়ারা, তার জাতগুলোর এমন অদ্ভুত নাম কেন হলো? ল্যাংড়া কিংবা চৌসা, এই নামগুলোর পেছনের পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে কয়েকশো বছরের পুরনো ইতিহাস, লোককথা এবং রোমাঞ্চকর যুদ্ধের গল্প।

প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে ভারতের উর্বর মাটিতে আমের চাষ হয়ে আসছে। বর্তমান পৃথিবীর মোট আম উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক অংশ একাই জোগাড় করে আমাদের এই দেশ। প্রাচীনকালে দক্ষিণ ভারতে একে ‘মাঙ্গা’ বা ‘আমকায়’ নামে ডাকা হতো। পরবর্তীকালে ১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ বণিকদের হাত ধরে সেই শব্দটি রূপান্তরিত হয়ে বিশ্বজুড়ে ‘ম্যাঙ্গো’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এমনকি মোগল আমলেও আমের কদর কিছুমাত্র কম ছিল না। তোতাপুরী থেকে শুরু করে কেশর, নানা সুস্বাদু পদের আমে সেজে উঠত রাজদরবার। এর অনেক পরে ১৭০০ সাল নাগাদ ভারতীয় আম আটলান্টিক পেরিয়ে বিদেশেও পাড়ি জমায়।

তবে আমপ্রেমীদের মনে সবচেয়ে বেশি কৌতুহল জাগায় ল্যাংড়া ও চৌসা নাম দুটি। ল্যাংড়া আমের মিষ্টি ও কড়া স্বাদের অনুরাগী আজ বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ। লোককথা অনুসারে, উত্তরপ্রদেশের বারাণসীর এক শারীরিক প্রতিবন্ধী বা ল্যাংড়া কৃষক প্রথম এই বিশেষ জাতের সুস্বাদু আমের চাষ শুরু করেছিলেন। তাঁর সেই শারীরিক পরিচয়ের নাম থেকেই লোকমুখে আমটির নাম পাকাপাকিভাবে ‘ল্যাংড়া’ হয়ে যায়।

অন্যদিকে, চৌসা আমের নামকরণের পেছনের রয়েছে একেবারে নিখাদ ঐতিহাসিক যুদ্ধের কাহিনী। ১৫৩৯ সালে বিহারের ‘চৌসা’ নামক স্থানে আফগান শাসক শেরশাহ সুরির সঙ্গে মোগল সম্রাট হুমায়ুনের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। সেই যুদ্ধে মোগলদের পরাজিত করে শেরশাহ সুরি উল্লাসে মেতে ওঠেন এবং এক বিশেষ জাতের মিষ্টি আম খেয়ে নিজের ঐতিহাসিক বিজয় উদ্‌যাপন করেছিলেন। সেই অঞ্চলের স্মৃতি এবং বিজয়ের প্রতীক হিসেবেই ওই সুস্বাদু আমটির নাম রাখা হয় ‘চৌসা’। বর্তমান সময়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুরু করে উত্তরপ্রদেশ কিংবা বিহার—ভারতের প্রতিটি কোণায় রাজত্ব করছে নিজস্ব সব বৈচিত্র্যময় জাত। আম কেবল একটি সাধারণ ফল নয়, এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়।