সিকিমের সুড়ঙ্গে ভয়াবহ ধস! ১১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে মৃতদের তালিকায় ৭ জনই পশ্চিমবঙ্গের চা শ্রমিক!

সিকিমের নামচি জেলার ঝোলুঙ্গে উপজেলার সমরদুং এলাকায় এনএইচপিসি তিস্তা স্টেজ-৬ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি নির্মিয়মাণ টানেলের প্রবেশপথ হঠাৎ ভয়াবহ ভূমিধসে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এই মর্মান্তিক বিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত মোট ১১ জন শ্রমিকের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সুড়ঙ্গের ভেতরে আরও বহু শ্রমিক ও আধিকারিকদের আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, মৃত ১১ জন শ্রমিকের মধ্যে সাতজনই পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ার্সের চা বাগান এলাকার গরিব পরিবারের মানুষ। এই আকস্মিক ও হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

প্রশাসনিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মৃত শ্রমিকদের সিংহভাগের বাড়িই পশ্চিমবঙ্গের মালবাজার মহকুমা এলাকায়। এর মধ্যে তিনজন শ্রমিক মেটেলি ব্লকের কিলকোট চা বাগানের ১১ নম্বর লাইনের বাসিন্দা বলে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন বাইকিসের ওরাওঁ, গ্যাবরিয়েল টিগ্গা এবং শিবা ওরাওঁ। এছাড়া পার্শ্ববর্তী নাগেশ্বরী এবং ইংডং চা বাগানের দুই শ্রমিক অমিত লাল করে ও শ্যাম ওরাওঁ এবং নাগরাকাটা ব্লকের অর্জুন সাঁওতাল ও বলো ওরাওঁ নামে আরও দুই চা শ্রমিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। জীবিকার তাগিদে সিকিমে কাজ করতে গিয়ে এমন এক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে প্রাণ হারানোয় তাঁদের পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, গত সোমবার কাজের চলাকালীন এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। এনএইচপিসির এডিআইটি-৩ টানেলের ঠিক ভেতরে সেই মুহূর্তে ১৯ জন শ্রমিক, ২ জন প্রকৌশলী এবং ৬ জন উর্ধ্বতন এনএইচপিসি আধিকারিক সহ মোট ২৭ জন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে ব্যাপক ধস নামায় ভেতরের সঙ্গে বাইরের যোগাযোগের সমস্ত পথ সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ হয়ে যায়। এর ফলে ভেতরে আটকে পড়া মানুষগুলোর কাছে দ্রুত সাহায্য পৌঁছে দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রাথমিক বিপর্যয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই টানেলের ভেতর থেকে মিথেন গ্যাস লিক শুরু হয়, যা পুরো উদ্ধারকাজকে আরও কয়েকশো গুণ বেশি জটিল ও বিপজ্জনক করে তোলে।

গ্যাস লিকের কারণে বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়ায় উদ্ধারকারী দলের জওয়ানদের পক্ষে সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আটকে থাকা মানুষগুলোকে উদ্ধারে মাঠে নেমেছে যৌথ বাহিনী। নামচি জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (ডিডিএমএ), রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এসডিআরএফ), এবং পাকইয়ং ও শিলিগুড়ি থেকে উড়ে আসা জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ)-এর অত্যন্ত দক্ষ দলগুলি একযোগে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে এনএইচপিসি-র শীর্ষ আধিকারিকরাও পুরো পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রেখেছেন।

বিপর্যয় মোকাবিলা করতে ঘটনাস্থলে নিয়ে আসা হয়েছে একাধিক ভারী যন্ত্রপাতি এবং অত্যাধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম। ধ্বংসাবশেষ ও মাটির স্তূপ সরিয়ে টানেলের ভেতরে একটি নিরাপদ যাতায়াতের পথ তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকা প্রতিটি মানুষের সঠিক খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত এই উদ্ধার অভিযান কোনোভাবেই থামবে না। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলা এই উদ্ধারকাজ এখন কোন দিকে মোড় নেয় এবং আটকে থাকা শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয় কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে গোটা দেশ।