ভারতে এল প্রথম ডেঙ্গি ভ্যাকসিন! টাকেডার তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’কে ড্রাগ কন্ট্রোলারের ঐতিহাসিক অনুমোদন!

ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক মোড় এনে টাকেডা বায়োফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেডের তৈরি দেশের প্রথম ডেঙ্গি প্রতিরোধক টিকা ‘কিউডেঙ্গা’ (QDENGA) আনুষ্ঠানিকভাবে ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অফ ইন্ডিয়া (DCGI)-র কাছ থেকে বাজারজাত করার চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে। সোমবার জাপানি এই প্রখ্যাত বায়োফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থার পক্ষ থেকে এই বড় সাফল্যের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতে ডেঙ্গির ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব ও ভয়াবহ সংকট মোকাবেলায় এই নতুন ভ্যাকসিনের আগমন চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক বিরাট মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কোম্পানির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, এই নতুন কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিনটি ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সি যে কোনো সুস্থ কিংবা পূর্বে ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হওয়া মানুষকে সম্পূর্ণ নিরাপদে প্রদান করা সম্ভব। বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই টিকা নেওয়ার পূর্বে আলাদাভাবে কোনো রক্ত পরীক্ষা বা পূর্ববর্তী ইনফেকশন স্ক্রিনিংয়ের কোনো প্রয়োজন হবে না। টাকেডার ইন্টারকন্টিনেন্টাল মার্কেটসের প্রধান মহেন্দ্র নায়েক সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, ২০২২ সালে বিশ্ববাজারে আত্মপ্রকাশ করার পর থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের মোট ৪৩টি রাষ্ট্রে এই ভ্যাকসিনের অনুমোদন মিলেছে এবং বিশ্বজুড়ে এর ৩ কোটি ২০ লক্ষের বেশি ডোজ সফলভাবে সরবরাহ করা হয়েছে। দীর্ঘ ৭ বছরের সুদীর্ঘ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য প্রমাণ করেছে যে, এই টিকা ডেঙ্গির চারটি আলাদা সিরোটাইপের বিরুদ্ধেই অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এবং রোগীদের হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি কমাতে পুরোপুরি সক্ষম।
ভারতে এই অনুমোদন পাওয়ার নেপথ্যে রয়েছে টাকেডার অত্যন্ত কঠোর গ্লোবাল ক্লিনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম। এর আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ২৮ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর প্রায় ১৯টি সফল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (ফেজ ১, ২ এবং ৩) চালানো হয়েছিল। এর পাশাপাশি, বিশেষভাবে ভারতীয় নাগরিকদের ওপর পরিচালিত ‘DEN-302’ নামক তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ইতিবাচক ফলাফলও এই ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত বড় ভূমিকা পালন করেছে। এই ট্রায়ালে দেশের ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সি সাধারণ মানুষের শরীরে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির সক্ষমতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হয়েছে।
ভ্যাকসিন প্রয়োগের সঠিক নিয়ম সম্পর্কে জানা গেছে যে, এটি ত্বকের ঠিক নিচে (Subcutaneously) ০.৫ মিলি মাত্রায় মোট দুটি পৃথক ডোজে প্রদান করা হয় এবং দুটি ডোজের মধ্যকার ব্যবধান অন্তত তিন মাস রাখা বাধ্যতামূলক। টাকেডার সাউথইস্ট এশিয়া ও ইন্ডিয়া ক্লাস্টারের মেডিকেল অ্যাফেয়ার্স হেড গোহ চু বেং উল্লেখ করেছেন যে, ভারতে ডেঙ্গি অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা এবং বহু অঞ্চলেই একসঙ্গে ডেঙ্গির একাধিক স্ট্রেন সক্রিয় থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ডেঙ্গিপ্রবণ অঞ্চলগুলিতে এই টিকা ব্যবহারের জোরালো সুপারিশ করেছে। উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে ১২৫টিরও বেশি দেশে ডেঙ্গির প্রকোপ রয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী মোট ডেঙ্গি আক্রান্তের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ একা ভারতেই নথিভুক্ত হয়। শহরায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতি বছর লক্ষাধিক ভারতীয় নাগরিক যেভাবে ডেঙ্গির মারণ ঝুঁকির মুখে পড়েন, তাতে এই নতুন ভ্যাকসিন দেশের স্বাস্থ্য মানচিত্রে এক নতুন সুরক্ষাবলয় তৈরি করবে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।