দিল্লির যন্তর মন্তরে ধুন্ধুমার! পুলিশের বলপ্রয়োগের প্রতিবাদে আমরণ অনশনে বসল এসএফআইয়ের শীর্ষ নেতৃত্ব!

শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, এনটিএ (NTA) দুর্নীতি এবং লাগাতার প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষ এক নতুন ও তীব্র মোড় নিয়েছে। শনিবার সকালে প্রখ্যাত সমাজকর্মী ও পরিবেশবিদ সোনম ওয়াংচুককে তাঁর অবনতিশীল স্বাস্থ্যের দোহাই দিয়ে দিল্লি পুলিশ জোরপূর্বক যন্তর মন্তরের আন্দোলনস্থল থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে। পুলিশ প্রশাসনের এই স্বৈরাচারী ও দমনমূলক আচরণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এবার সরাসরি ময়দানে নেমে পড়েছে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন বা এসএফআই (SFI)। সোনম ওয়াংচুকের এই গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের ব্যাটন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে শনিবার থেকেই দিল্লির যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করে দিয়েছেন এসএফআই-এর সর্বভারতীয় সভাপতি আদর্শ এম সাজি এবং সর্বভারতীয় যুগ্ম সম্পাদক ঐশী ঘোষ।

পুলিশের এই বলপ্রয়োগের তীব্র নিন্দা করে এসএফআই নেতৃত্ব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, এই লড়াই শুধু দিল্লি বা যন্তর মন্তরের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য চরম ক্ষোভ উগরে দিয়ে অভিযোগ করেছেন যে, দিল্লি পুলিশের এই অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে দেশের প্রতিটি কোণায় ছাত্রসমাজ রাস্তায় নেমে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রান্তে প্রতীকী এবং দীর্ঘমেয়াদি অনশন কর্মসূচি পালন করা হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর সমালোচনা করে সৃজন জোরালো প্রশ্ন তোলেন, সোনাম ওয়াংচুক এবং আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্য ও জীবন নিয়ে যদি কেন্দ্রের মোদি সরকারের সত্যি এতই উদ্বেগ থাকত, তবে কেন সরকারের তরফ থেকে কোনো দায়িত্বশীল প্রতিনিধি এসে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিলেন না? কেন তাঁদের দীর্ঘদিনের ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে?

বর্তমান কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে এক হাত নিয়ে সৃজন ভট্টাচার্য তাঁকে সরাসরি একজন ‘ব্যর্থ শিক্ষামন্ত্রী’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, নিট (NEET) কিংবা সিবিএসই-র (CBSE)-র মতো দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলিতে যে নজিরবিহীন বিপর্যয় ও কেলেঙ্কারি ঘটেছে, তা একবাক্যে প্রমাণ করে দিয়েছে যে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী কিংবা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA) এই বিশাল শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করার জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য। শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ত্রুটিপূর্ণ সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধেই মূলত সোনাম ওয়াংচুক ও দেশের ছাত্রসমাজ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। কেন্দ্রীয় সরকার যদি ভেবে থাকে যে আন্দোলনকারীদের জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে বা বলপ্রয়োগ করে তাঁদের মনোবল ভেঙে দেওয়া যাবে, তবে তা সরকারের এক বিরাট ভুল ধারণা। আদর্শ এম সাজি এবং ঐশী ঘোষের এই আমরণ অনশন আন্দোলন সারা দেশের ছাত্রসমাজকে আরও ঐক্যবদ্ধ করবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে অবিলম্বে ছাত্রদের সমস্ত যৌক্তিক দাবি মেনে নিতে বাধ্য করবে।

এই গণআন্দোলনে সংহতি জানিয়ে এবং কেন্দ্রের শাসক দলের জনবিরোধী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে প্রবীণ বাম নেতা এম এ বেবি এক হুশিয়ারিতে বলেন, নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ এবং মোহন ভাগবত যদি এইভাবে প্রশাসনিক ব্যর্থতার পরেও ধর্মেন্দ্র প্রধানকে আড়াল করার অসাধু প্রচেষ্টা চালিয়ে যান, তবে আগামী দিনে তারা নিজেদের রাজনৈতিক পতন থেকেও রক্ষা করতে পারবেন না।

আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে মূলত তিনটি প্রধান ও জোরালো দাবিকে সামনে রেখেই এই অনশন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। প্রথমত, প্রশাসনিক ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায় স্বীকার করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ ও ইস্তফা; দ্বিতীয়ত, চরম বিতর্কিত, দুর্নীতিগ্রস্ত ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে জর্জরিত ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা NTA-কে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা; এবং তৃতীয়ত, আসন্ন সংসদ অধিবেশনে নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি সহ দেশের বর্তমান ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থার যাবতীয় দুর্বলতা ও পরিকাঠামোগত ফাঁকফোকর নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করা। দিল্লির এই ছাত্র আন্দোলন এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অনড় মনোভাবকে কেন্দ্র করে আগামী দিনগুলিতে যে জাতীয় রাজনীতি আরও বহুগুণ উত্তপ্ত হতে চলেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।