মোদীর স্বপ্নের ট্রেন নিয়ে বড় জালিয়াতি! উদ্বোধনের পরই কি বিকল হলো দেশের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন?

দেশের প্রথম দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হাইড্রোজেন ট্রেনকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ার অন্তর্জাল বর্তমানে একটি মারাত্মক ও বিভ্রান্তিকর ভিডিওকে কেন্দ্র করে চরম উত্তাল হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া কিছু সংক্ষিপ্ত ক্লিপে জোরালো দাবি করা হচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাত ধরে বহুচর্চিত এই ট্রেনটির উদ্বোধনের ঠিক পরের দিনই সেটি নাকি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায় এবং বাধ্য হয়ে সেটিকে একটি পুরোনো ডিজেল ইঞ্জিন দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে হয়। এই চাঞ্চল্যকর দাবি সামনে আসতেই মুহূর্তে তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়। তবে এই সমস্ত ভুয়া ও ভিত্তিহীন দাবিকে এক ফুৎকারে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছে খোদ ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষ। রেলের তরফ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে, ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওটি সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে অত্যন্ত চক্রান্তমূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং ট্রেনের যান্ত্রিক ত্রুটির কোনো ঘটনাই ঘটেনি।

সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন হ্যান্ডেলে যে ভিডিওটি নিয়ে শোরগোল পড়েছিল, তাতে দেখা যাচ্ছে যে একটি হাইড্রোজেন ট্রেনের ঠিক পাশেই একটি ডিজেল লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন যুক্ত রয়েছে। এই দৃশ্যকে হাতিয়ার করেই দাবি করা হয় যে দেশের প্রথম দেশীয় হাইড্রোজেন ট্রেনটি উদ্বোধনের প্রথম দিনেই বিকল হয়ে পড়েছে এবং সেটিকে ডিজেল ইঞ্জিনের সাহায্য নিয়ে ডিপোয় ফেরাতে হয়েছে। এই ভুয়ো দাবিটি সাইবার দুনিয়ায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় এবং মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ তা শেয়ার করতে শুরু করেন।

এই চরম বিভ্রান্তির মুখে দাঁড়িয়ে নর্দার্ন রেলওয়ের দিল্লি ডিভিশনের অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে দ্রুত এই বিষয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত এই সমস্ত তথ্য সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তবের সাথে এর দূরদূরান্তের কোনো সম্পর্ক নেই। রেলের স্পষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী, হাইড্রোজেন ট্রেনটিতে কোনো ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি বা কারিগরি সমস্যা দেখা দেয়নি। যথাযথ তথ্য যাচাই না করেই এই ধরনের উস্কানিমূলক ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।

রেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আরও বিশদে জানানো হয়েছে যে, এই অত্যাধুনিক হাইড্রোজেন ট্রেনটি বর্তমানে পরীক্ষামূলক ও নিয়মিতভাবে শুধুমাত্র হরিয়ানার জিন্দ এবং সোনিপতের মধ্যে চলাচল করছে। স্বাভাবিক ট্রেন চলাচলের রুটিন ছাড়াও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ (Maintenance), পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা ডিপোয় আনা-নেওয়ার কাজের জন্য মাঝেমধ্যে একটি আলাদা লোকোমোটিভ ইঞ্জিন ব্যবহার করা রেলের রুটিন প্রসিডিওরের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। রেলের আধিকারিকরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, এটি সম্পূর্ণরূপে সাধারণ ও আদর্শ পরিচালন পদ্ধতির একটি অঙ্গ এবং ট্রেনের যান্ত্রিক কোনো গোলযোগের সাথে এর বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। অতএব, ডিজেল ইঞ্জিনযুক্ত একটি ট্রেনের উপস্থিতিকে বিকল হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা সম্পূর্ণ অজ্ঞতা ও ভুলের ফল।

নর্দার্ন রেলওয়ের পক্ষ থেকে এই সমস্ত ভাইরাল পোস্ট এবং দাবিগুলিকে একবাক্যে তথ্যগতভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, অমূলক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেশের সাধারণ নাগরিকদের কাছে জোরালো আবেদন জানানো হয়েছে যেন সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ধরনের ভিডিও বা ব্রেকিং পোস্ট দেখার সঙ্গে সঙ্গেই তা অন্ধের মতো বিশ্বাস না করা হয়। সর্বদা সরকারি এবং প্রামাণ্য উৎস থেকে তথ্য যাচাই করে নেওয়ার পরেই তা গ্রহণ করা উচিত এবং ভুয়ো বা যাচাইবিহীন তথ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়।

উল্লেখ্য, গত ১৭ জুলাই তারিখটি ভারতীয় রেলওয়ের ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কারণ ওই দিনই দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হরিয়ানার ঐতিহাসিক জিন্দ স্টেশন থেকে দেশের প্রথম দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত হাইড্রোজেন ট্রেনের শুভ সূচনা করেছিলেন। এই রুটটি জিন্দ এবং সোনিপতের মধ্যে প্রায় ৮৯ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে চলাচল করছে। ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবেশবান্ধব শক্তি-ভিত্তিক সবুজ রেল পরিবহনকে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রকল্পটিকে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ যাত্রীদের আর্থিক সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখেই এই ট্রেনের টিকিটের ন্যূনতম ভাড়া মাত্র ৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৫ টাকার মধ্যে অত্যন্ত সাশ্রয়ী রাখা হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষের মতে, হাইড্রোজেন প্রযুক্তি ভবিষ্যতের গ্রিন ট্রানজিট তথা পরিবেশবান্ধব পরিবহনের ক্ষেত্রে এক সোনালী বিপ্লব আনতে চলেছে, তাই এই ধরনের উদ্ভাবনী প্রকল্প নিয়ে যেকোনো ধরনের অপপ্রচার ও ভুল তথ্য এড়িয়ে চলা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।