শেষ বিশ্বকাপেও হলো না শেষরক্ষা! স্পেনের কাছে হেরে ট্রফি হাতছাড়া মেসির, টুর্নামেন্টের সেরা গোল্ডেন বল কার হাতে উঠল?

২০১৪ সালের পর ফের ২০২৬—বিশ্বকাপের ফাইনালে এসে মর্মান্তিক ট্রফি হাতছাড়া হওয়ার বেদনা সইতে হলো ফুটবলের বরপুত্র লিওনেল মেসিকে। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই দুর্দান্ত ফর্মে থেকেও ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে ১-0 গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। এই জয়ের সুবাদে সুদীর্ঘ ১৬ বছর পর ফের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করল স্পেন। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় মঞ্চে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নেমেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অবিশ্বাস্য নজির গড়লেন তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামাল। এদিকে, ৩৯ বছর বয়সি মহাতারকা লিওনেল মেসির বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সম্ভবত এটাই ছিল শেষ বিশ্বকাপ। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মিষ্টি স্বাদ পেলেও ২০২৬-এর আমেরিকা ও মেক্সিকো আসর থেকে সম্পূর্ণ খালি হাতেই ঘরের পথে ফিরতে হলো মেসিকে। টানটান উত্তেজনায় ভরপুর এই মেগা ফাইনালে আর্জেন্টিনা দল দীর্ঘ ১২০ মিনিটের খেলায় স্পেনের পোক্ত রক্ষণভাগের সামনে একটিও নিশ্চিত গোলমুখী শট রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ম্যাচের পুরোটা সময় মেসির নিজের তৎপরতাও স্পেনের বক্সে হাতেগোনা কয়েকটি আক্রমণের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। স্পেনের জমাট রক্ষণ এবং নিখুঁত রণকৌশলের কাছে এভাবে লা আলবিলেস্তেদের আত্মসমর্পণ প্রমাণ করে দেয় যে বর্তমান বিশ্ব ফুটবলে স্প্যানিশরা কতটা নিখুঁত প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছিল। টুর্নামেন্টের এই জমজমাট পরিসমাপ্তির পর স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছিল, এবারের বিশ্বকাপের ব্যক্তিগত ও দলীয় শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কারগুলি শেষ পর্যন্ত কার কার ঝুলিতে গেল?

ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর বিভিন্ন ব্যক্তিগত পুরস্কারের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন বুট’ নিজের নামের পাশে খোদাই করে নিয়েছেন ফ্রান্সের মহাতারকা কিলিয়ান এমবাপে। গোটা টুর্নামেন্টে অবিশ্বাস্য ফর্মে থেকে তিনি মোট ১০টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে ৪টি গোল করিয়েছেন। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও তিনি জোড়া গোল ও একটি চোখ জুড়ানো অ্যাসিস্ট করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। এমবাপের ঠিক ঘাড়েই নিঃশ্বাস ফেলছিলেন আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি, যাঁর ঝুলিতে রয়েছে ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট।

অন্যদিকে, গোটা টুর্নামেন্ট জুড়ে অসাধারণ নেতৃত্ব এবং মাঝমাঠে নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে এবারের বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলারের সর্বোচ্চ সম্মান অর্থাৎ ‘গোল্ডেন বল’ জিতে নিয়েছেন স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি। ক্লাব ফুটবলে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলা এই অভিজ্ঞ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই শুরু থেকে খেলে দলকে সামনে থেকে নিখুঁতভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রক্ষণ ও আক্রমণভাগের মাঝে সুদৃশ্য সেতু তৈরি করে তাঁর ধারাবাহিক ও দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই স্পেনকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি ছিল।

গোলরক্ষকদের লড়াইয়ে এবারের বিশ্বকাপের সেরা ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ অর্জন করে নিয়েছেন স্পেনের বিশ্বস্ত প্রহরী উনেই সিমন। গোটা টুর্নামেন্টের দীর্ঘ যাত্রায় স্পেনের এই গোলরক্ষক অবিশ্বাস্যভাবে মাত্র একটি গোল হজম করেছেন। তাঁর অতি আক্রমণাত্মক গোলকিপিং এবং চাপের মুখেও ঠান্ডা মাথায় গোলপোস্ট রক্ষা করার দক্ষতা ফুটবল বিশেষজ্ঞদের একডাকে মুগ্ধ করেছে। ফলে সম্পূর্ণ যোগ্য এবং নিখুঁত মানুষের হাতেই উঠেছে এই মেগা গ্লাভস।

পাশাপাশি, উদীয়মান তরুণ তারকাদের মধ্যে সেরা তরুণ ফুটবলারের পুরস্কার জিতে নিয়েছেন স্পেনের রক্ষণভাগের অন্যতম কাণ্ডারি পাও কুবারসি। মাত্র ১৯ বছর বয়সে যেভাবে তিনি গোটা টুর্নামেন্ট জুড়ে দেওয়ালের মতো ডিফেন্স সামলেছেন, তা সত্যিই অভাবনীয়। তাঁর দুর্দান্ত ম্যাচ রিডিং ও ট্যাকটিক্যাল বুদ্ধিমত্তার ফলেই স্পেন একাধারে আক্রমণ এবং রক্ষণ—দুই বিভাগেই সমানভাবে সাবলীল থাকতে পেরেছিল। সব মিলিয়ে, রেকর্ড ও রোমাঞ্চে ভরপুর ২০২৬ সালের এই মহাযুদ্ধের পর্দা নামল স্পেনের সোনালী সাফল্যের হাত ধরে।