বাগে আসছে না দলবদল! একের পর এক হেভিওয়েট নেতার দলত্যাগে কী বার্তা দিলেন মমতা?

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরমহলে এখন ভাঙনের সুর। গত কয়েকদিনে রাজ্যের শাসকদলের একের পর এক হেভিওয়েট নেতার দলত্যাগ ও নতুন শিবিরে যোগদান রাজ্য রাজনীতিতে এক বড়সড় তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ও অনুব্রত মণ্ডলের পর এবার এই তালিকায় নতুন সংযোজন মদন মিত্র। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এই নেতারা একে একে কালিঘাটের সঙ্গ ছেড়ে যোগ দিচ্ছেন ঋতব্রত বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক শিবিরে। রাজ্য রাজনীতির এই হঠাৎ বাঁকবদলকে ‘১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া’ হিসেবেই বর্ণনা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নেতাদের এই দলবদল কেবল রাজ্য রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তৃণমূলের সংসদীয় কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। জানা যাচ্ছে, এক ধাক্কায় তৃণমূল নিজের ২০ জন সাংসদকে হারিয়েছে। এই সাংসদদের বড় অংশ এখন ‘বেনামী’ NCPI নামক একটি নতুন রাজনৈতিক মঞ্চে সক্রিয়। শুধু লোকসভা নয়, রাজ্যসভার অন্দরমহলেও চলছে দলবদলের খেলা। দলের দুই প্রবীণ ও পরিচিত মুখ সুখেন্দুশেখর রায় এবং সুস্মিতা দেবও তৃণমূলের পতাকা ছেড়ে অন্য শিবিরে নাম লিখিয়েছেন। কালীঘাটের অন্দরমহলে যখন এই ভাঙনের খবর পৌঁছাচ্ছে, তখন দলের অন্দরে তৈরি হয়েছে চরম অস্বস্তি।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই রাজনৈতিক দলবদলকে অত্যন্ত কঠোরভাবে দেখছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা দল ছেড়ে যাচ্ছেন, তাদের অনেক ‘লাগেজ-ব্যাগেজ’ বা দুর্নীতির বোঝা রয়েছে। নেত্রীর দাবি, “যাঁদেরই এই ধরনের বোঝা বা ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে, তাঁরাই শেষ পর্যন্ত বিজেপির কোলে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন।” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করতে চেয়েছেন যে, নেতাদের এই দলত্যাগ নেপথ্যে রাজনৈতিক আদর্শের চেয়েও ব্যক্তিগত স্বার্থরক্ষার লড়াই বেশি কাজ করছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূলের এই ধারাবাহিক ভাঙন আগামী দিনে রাজ্যের ক্ষমতা দখল বা ধরে রাখার লড়াইয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন দলের নিচুতলার সংগঠনকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই দলের প্রথম সারির নেতাদের এভাবে চলে যাওয়া তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, মদন মিত্রের মতো একজন জনপ্রিয় নেতার শিবির বদল তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখন থেকেই জল্পনা তুঙ্গে।
আগামী বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনের আগে এই দলবদলের ঢেউ তৃণমূলকে কতখানি দুর্বল করতে পারে, সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। তৃণমূলের এই ‘নতুন গোষ্ঠী’ বা এনসিপিআই-এর উত্থান কি রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির নতুন মেরুকরণ ঘটাবে? নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের একবার তার ক্যারিশমায় এই ভাঙন রোধ করে ঘুরে দাঁড়াবেন? উত্তর দেবে সময়, কিন্তু বর্তমানের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা যে রাজ্যকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য। তৃণমূলের এই ‘লাগেজ-ব্যাগেজ’ তত্ত্ব এবং তার ফলে হওয়া ভাঙন এখন রাজ্যের প্রতিটি স্তরে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে।