রথের দড়ি টানলেই মিলবে মোক্ষ! আষাঢ়ের এই দিনে কেন পুরী যাওয়া আবশ্যিক?

আজ আষাঢ়ের শুক্লা দ্বিতীয়া। চারিদিকে ঢাকের বাদ্যি আর উলুধ্বনির মাঝে মহাধুমধামে পালিত হচ্ছে রথযাত্রা। সুসজ্জিত রথে সওয়ার হয়ে মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। সনাতন ধর্মের বারোটি প্রধান উৎসবের অন্যতম এই রথযাত্রা কেবল একটি লোক উৎসব নয়, এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে গভীর দার্শনিক তাৎপর্য ও আধ্যাত্মিক রহস্য।

পুরাণ অনুযায়ী, রথযাত্রা আসলে শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা থেকে বৃন্দাবনে প্রত্যাবর্তনের এক প্রতীকী উদযাপন। ভক্তদের বিশ্বাস, রথে উপবিষ্ট বিগ্রহের দর্শন পাওয়া মানেই জীবনের সকল পাপের বিনাশ হওয়া। ‘স্কন্দপুরাণ’-এ স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, রথে উপবিষ্ট জগন্নাথদেবকে দর্শন করলে পুনর্জন্মের বন্ধন থেকে মুক্তি মেলে। রথযাত্রার সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং পবিত্র মুহূর্ত হলো রথের দড়ি টানা। শাস্ত্র মতে, এই দড়ি সাধারণ কোনো দড়ি নয়, এটি ভক্তির প্রতীক। দড়িতে হাত দেওয়া বা সামান্য টান দেওয়া মানেই ঈশ্বরের সাথে এক আত্মিক সংযোগ স্থাপন করা।

পুরীর রথযাত্রার ঐতিহ্য ও আচার-অনুষ্ঠান অত্যন্ত প্রাচীন এবং আড়ম্বরপূর্ণ। এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ‘ছেরা পাহরা’ নামক আচার। রথযাত্রার আগে পুরীর গজপতি রাজা সশরীরে রথের সামনে উপস্থিত হন এবং সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথ ও তার চারপাশ পরিষ্কার করেন। এই আচারটি রাজার অহংকার ত্যাগের এক নিদর্শন এবং সাম্যবাদের প্রতীক। রাজা বা প্রজা, ঈশ্বরের সামনে সবাই সমান—এই দর্শনেই পালিত হয় রথযাত্রা।

রথযাত্রার এই শুভক্ষণে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় জমছে পুরীর গ্র্যান্ড রোডে। তিন দেব-দেবীর জন্য তিনটি আলাদা রথ—নন্দীঘোষ, তালধ্বজ ও দর্পদলন। ভক্তদের বিশ্বাস, জগন্নাথদেব যখন রথে চেপে মাসির বাড়ি যান, তখন তিনি জগতের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট নিয়ে যান এবং ভক্তদের আশীর্বাদ করেন। এই উৎসব কেবল ওড়িশাতেই নয়, বরং সারা বিশ্বজুড়ে ইসকন এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালিত হয়। রথযাত্রার এই শুভ দিনটি আমাদের জীবনপথে নতুন উদ্দীপনা এবং ধর্মবিশ্বাসের জাগরণ ঘটায়। আষাঢ়ের আকাশ তলে আজ যেন স্বর্গের হাতছানি, রথের রশিতে টান দেওয়ার অপেক্ষায় কোটি কোটি ভক্তের হাত।