পুলিশের কো-অপারেটিভ থেকে সুভেনিরের নামে তোলাবাজি! শান্তনুর কাণ্ডে ফাঁস ইডির চার্জশিটে

কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ইন্সপেক্টর তথা কালীঘাট থানার প্রাক্তন ওসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের উত্থান এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জট ক্রমশ খুলছে। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর সাম্প্রতিক চার্জশিটে শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা রীতিমতো চাঞ্চল্যকর। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, শান্তনু সিনহা বিশ্বাস যখন হেয়ার স্ট্রিট থানার ওসি ছিলেন, তখন তিনি একজন দক্ষ পুলিশ আধিকারিক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু কালীঘাট থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর কার্যকলাপে আমূল পরিবর্তন আসে।
ইডির চার্জশিটে এক ইন্সপেক্টরের বয়ানের উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি একাধিক থানায় শান্তনুর অধীনে কাজ করেছেন। ওই ইন্সপেক্টরের মতে, কালীঘাট থানার ওসির চেম্বারটি এক সময় কার্যত পুলিশের কাজ নয়, বরং ব্যবসায়িক বৈঠকের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। ইডির দাবি, শান্তনুর ওই বিশেষ চেম্বারে থানার সাধারণ পুলিশকর্মীদের প্রবেশে এক প্রকার অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। সেখানে জয় কামদারের মতো ব্যবসায়ীদের অবাধ যাতায়াত ছিল এবং পুলিশকর্মীদের চেয়ে ওই ব্যবসায়ীদেরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো বলে অভিযোগ।
তদন্তকারী সংস্থার চার্জশিট অনুযায়ী, জয় কামদারের সঙ্গে শান্তনু সিনহা বিশ্বাস একাধিকবার গোপন বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকগুলিতে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত গল্প নয়, বরং বিভিন্ন থানার পুলিশের বদলি সংক্রান্ত পরিকল্পনা এবং সেই সংক্রান্ত তালিকা তৈরির বিষয়ে আলোচনা হতো বলে দাবি ইডির। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের পছন্দমতো বদলি প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
শুধুমাত্র বদলি বা ক্ষমতার চর্চাতেই থেমে থাকেননি শান্তনু। ইডির চার্জশিটে পুলিশ ওয়েলফেয়ার কমিটি এবং পুলিশের কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কে তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যের কথা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। বর্তমান এক সাব-ইন্সপেক্টরের বয়ান উদ্ধৃত করে ইডি দাবি করেছে, অনুদানের নামে জোর করে অর্থ সংগ্রহের এক বড়সড় চক্র চালিয়েছিলেন শান্তনু।
চার্জশিটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি থানায় সুভেনির (Souvenir) বা স্মারক পাঠানোর আড়ালে এক সুপরিকল্পিত তোলাবাজির ছক তৈরি করা হয়েছিল। ওই সুভেনিরের নাম করে ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত তোলা হতো। চেক এবং নগদ—উভয় মাধ্যমেই চলত এই লেনদেন। শুধু সুভেনির নয়, বিজ্ঞাপন সংস্থার আড়ালেও চলছিল বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন। বিভিন্ন বিজ্ঞাপন সংস্থার মাধ্যমে ৫০ হাজার থেকে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সংগ্রহ করে তা সরাসরি ওয়েলফেয়ার কমিটিতে জমা করা হতো। সরকারি ব্যবস্থার আড়ালে থেকে সাধারণ পুলিশকর্মীদের ব্যবহার করে কীভাবে এই বিশাল আর্থিক দুর্নীতি চালানো হতো, ইডির চার্জশিট এখন সেই অন্ধকার দিকের ওপরই আলোকপাত করেছে। শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এই অভিযোগগুলি প্রমাণিত হলে তা কলকাতা পুলিশের ভাবমূর্তিতে বড়সড় ধাক্কা দিতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল।